দ্বীপজেলা ভোলার লালমোহন উপজেলার জেলেপল্লীগুলোতে অভাব-অনটনে সর্বাবস্থায় হাহাকার। গত ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দীর্ঘ দুই মাস মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। ওই নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে আশানুরূপ মাছ না পেয়ে খালি হাতে ফিরে আসতে হয়েছে জেলেদের।
জেলেরা আশা করেছিলেন জুন-জুলাই বা জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে মাছের দেখা মিলবে, কিন্তু সে আশা নিরাশায়ে রূপ নিয়েছে। আশানুরূপ মাছ না পেয়েও দাদন ও সুদের দেনার ফাঁদে আটকে আছেন জেলেরা। দেনা থেকে মুক্তি মিলছে না মৃত্যুতেও।
জানা যায়, মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীতে একসময় পর্যাপ্ত ইলিশ পাওয়া যেত এবং মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীকে ইলিশের রাজ্য বলা হতো। অথচ এখন বলা যায় মাছের রাজ্যে মাছের আকাল, জেলেপল্লীতে হাহাকার। নদীতে গিয়ে আশানুরূপ মাছ না পাওয়ায় দিনের পর দিন বাড়ছে সুদের মুনাফা। জেলেদের জীবন কাটছে দুরাশায়, চোখে-মুখে দেখছেন শুধু কুয়াশা। অন্যদিকে জেলেপল্লীর শিশু-কিশোররাও দিন দিন ঝরে পড়ছে পড়াশোনা থেকে। তারা বেছে নিয়েছে বাপ-দাদার মাছ ধরার পেশা।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২৪ হাজার ৮০৬ জন। তবে এর প্রকৃত সংখ্যা অন্তত ৩০ হাজারের বেশি, যারা কেবল মাছ ধরার ওপরই নির্ভরশীল। লালমোহন উপজেলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী এলাকায় ছোট-বড় অন্তত ২৫-৩০টি মৎস্যঘাট থেকে জেলেরা মাছ ধরতে নদীতে যায়। উপজেলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাকে অভয়াশ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
উপজেলার কোভখালী ও গাইট্রার খাল মাছঘাটের ৪০ ও ৩৮ বছর বয়সী জেলে মো. নাজিম উদ্দিন ও মো: আলী, আবুল কালাম এবং মো: রফিক মাঝি। তাদের পেশা শুধু মাছ শিকার করা। তাদের বয়সের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছে মেঘনা নদীতে মাছ শিকার করে। এই নদীই তাদের জীবিকার একমাত্র মাধ্যম।
বুড়িরদোন ঘাটের মৎস্যজীবী মো: শাহে আলম মাঝি বলেন, ‘গত দুই মাস আগে শেষ হওয়া নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রায়দিনই ১৫ জন জেলেসহ মেঘনা নদীতে মাছ ধরতে যাই। একদিন নদীতে মাছ ধরার জন্য ট্রলারের তেল, চাল, ডাল এবং অন্যান্য খরচ বাবদ প্রায় ১০-১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়ে থাকে। সারারাত মাছ ধরে সকালে ঘাটে ফিরে মাছ বিক্রি করেছি গড়ে মাত্র ৭-৮ হাজার টাকার। সেখান থেকে কমিশন বাবদ প্রায় নয়শত টাকা কেটে রেখে দেন আড়তদার। লাভ তো দূরের কথা, লোকসানই হয় প্রায় ৪-৫ হাজার টাকা। এতে করে দিনের পর দিন দেনার পরিমাণ কেবল বাড়ছেই। নদীতে তেমন মাছ না থাকায় এখন আর মাছ ধরতে যাইতে ইচ্ছে করে না।’
সর্দারের খাল মাছঘাটের জেলে মো: রফিক মিয়ার মতো এমন অনেক জেলেই লোকসানের ভয়ে নদীতে যাচ্ছেন না বলে এ প্রতিনিধিকে জানান। যার ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে অভাবে দিন কাটছে লালমোহন উপজেলার অধিকাংশ জেলেদের। ওই মৎস্যঘাটের মোসলেম উদ্দিন মাঝি, আজাহার মাঝি, রতন মাঝি, সিরাজ মাঝিসহ আরও বেশ কয়েকজন জেলে জানান,
‘আমরা লক্ষ্য করে দেখেছি, যখন নদীতে মাছ থাকে তখন মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। আর যখন মাছ থাকে না তখন নিষেধাজ্ঞাও থাকে না। এ কারণেই মূলত আমরা মাছ পাচ্ছি না, ধার-দেনায় জড়িয়ে থাকি বছরের পর বছর। তাই মৎস্য বিভাগসহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের অনুরোধ রইল সামনের দিকে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বিবেচনা করে দেখার।’
ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের বাতিরখাল মৎস্যঘাটের জেলে আনিছুল হকসহ আরও একাধিক জেলে বলেন, মহাজনরা আড়তদারদের কাছ থেকে দাদনের টাকা নিয়ে নৌকা বা ট্রলারে থাকা অন্যান্য জেলেদের মাঝে টাকা বিতরণ করেন। এরপর মহাজন নদীতে মাছ ধরতে যাওয়ার সময় দাদনের টাকা নেওয়া ১৫-১৬ জন জেলেকে সাথে নেন। জেলেরা মাছ ধরা এবং বিক্রির ওপর টাকা পায়। দেখা যায় জেলেরা নদীতে মাছ ধরতে যাওয়ার আগে আড়তদারের কাছ থেকে যে টাকা নেন, মাছ না পেলে ওই টাকা দেনাই থেকে যায়। আবার নতুন করে মাছ ধরতে গেলে আড়তদারের কাছ থেকে আবারও দাদন নিয়ে যেতে হয়। এভাবে দাদনের টাকা বাড়তে বাড়তে এক সময় ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যায়। জেলেরা যতদিন নদীতে মাছ ধরবে, ততদিন আড়তদার দাদনের টাকা ফেরত চায় না। জেলেরা যখন মাছ ধরা ছেড়ে দেয়, তখনই ফয়সালার মাধ্যমে আড়তদারের টাকা ফেরত দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ওই টাকা ফেরত দিতে গিয়ে দেনাগ্রস্ত অনেক জেলেকে ভিটেমাটি বিক্রি করতে হয়। যার কারণে ইচ্ছা থাকার পরও অনেকে জেলে পেশা ছাড়তে পারছেন না। এভাবেই অধিকাংশ জেলেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এ পেশায় জড়িয়ে বেড়াতে হয় দাদনের বোঝা। মৃত্যুর পরও মেলে না মুক্তি, কারণ দাদন নিয়ে মারা গেলেও জেলেদের ওয়ারিশদের দাদনের ওই টাকা ফেরত দিতে হয়।
অন্যদিকে জেলেপল্লীর শিশু-কিশোররাও ঝরে পড়ছে লেখাপড়া থেকে। পড়াশোনা ছেড়ে তারা জড়াচ্ছে বাপ-দাদার মাছ ধরার পেশায়। কামারের খাল ও জোড়া খাল মৎস্যঘাটে এমনই কয়েকজন ১৪-১৫ বছর বয়সী শিশুকে দেখা যায়। বিদ্যালয়ের বারান্দায় তাদের ছোঁয়া লেগেছে ঠিকই, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কোনো রকমে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হয়েছিল ষষ্ঠ শ্রেণিতে। তখন থেকে মাঝেমধ্যে স্বজনদের সঙ্গে নদীতে যাওয়া শুরু হয় শিশু-কিশোরদের। একপর্যায়ে নদীতে মাছ শিকার করা তাদের পেশা হয়ে যায় এবং তারা পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।
মেঘনা তীরবর্তী এলাকার শিপন ও রিয়াজ নামের দুইজন শিশু জানায়, স্বজনদের সঙ্গে প্রথমে শখ করে নদীতে যাওয়া শুরু করে। সেই শখই এখন পেশা। প্রথম প্রথম নদীর উত্তাল ঢেউ দেখে ভয় হতো, তবে এখন সেই ভয় কেটে গেছে। এখন স্থানীয় অন্যান্য জেলেদের সঙ্গে নিয়মিত মাছ শিকারে যায়। যেদিন মাছ শিকারে যায় সেদিন কখনো দুইশত, কখনো চারশত টাকা পায়; আবার কখনো খালি হাতেই ফিরতে হয়। যখন নদীতে গিয়ে মাছ ধরে টাকা পায়, তখন ওই টাকা মা-বাবার হাতে তুলে দেয়।
ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের পাটোয়ারীর হাট সংলগ্ন মৎস্যঘাটের আড়তদার ও ঘাটের সাধারণ সম্পাদক মো. সালাউদ্দিন দালাল বলেন, এ ঘাটে ৪৫-৬০টি মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে। এতে এ ঘাটে দুই থেকে আড়াই হাজার জেলে পেশাজীবী রয়েছে। গত অবরোধের পর বর্তমানে জেলেরা নদীতে মাছ ধরতে নেমে প্রতিদিন প্রায় খালি হাতেই ফিরছে। তিনি আরও বলেন, একে তো নদীতে মাছ নেই, তার ওপর কোস্ট গার্ডের আতঙ্ক থাকে জেলেদের মনে। উক্ত মৎস্যঘাটের সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, বড় মাছ তো পাওয়াই যায় না, দু-চারটি জাটকা ইলিশ ছাড়া মিলছে না কোনো কিছু। এতে করে লোকসান গুনতে হচ্ছে জেলেদের।
মেঘনা নদী তীরবর্তী কোবখালী মাছঘাটের আড়তদার মো. ইব্রাহিম দালাল বলেন,
‘আমার ছেলে গত মৌসুমে (ইলিশের মৌসুমে) বোট মালিক ও জেলেদের প্রায় ১৮ লাখ টাকা দাদন দিয়েছে, কিন্তু সে টাকা আজ পর্যন্ত উঠাতে পারেনি। এখন সে সৌদি আরব প্রবাসী। আমিও এ বছর প্রায় ১৫ লাখ টাকা দাদন দিয়েছি। কিন্তু আশানুরূপ মাছ না পেয়ে জেলেদের সাথে আমরা আড়তদারেরাও এখন হতাশায় রয়েছি।’
তিনি আরো বলেন, গভীর সাগর থেকে ইলিশ এদিকে আসতে দেয়া হয় না। খাল-বিলের মতো সাগরেও ফিশিং বোট দিয়ে অবৈধ জাল ব্যবহার করে ইলিশসহ সকল প্রকার মাছের পোনা ধ্বংস করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি সাগরের মাছ ধরার এসকল অবৈধ জালের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে নদীতে মাছ ধরা জেলেরা হয়তো তাদের আশানুরূপ মাছ পাবে।
লালমোহন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (চ. দা.) মো: আলী আহমদ আখন্দ বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় বা প্রতিকূল পরিবেশের কারণে নদীতে মাছ কম আসছে, তবে সাগরে প্রচুর মাছ রয়েছে। আশা করি সামনের দিনগুলোতে মাছ পড়বে। এখন প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে, নদীর পানি বাড়বে, নদীতে মাছও আসবে। জেলেরা নদীতে গিয়ে তাদের আশানুরূপ মাছ পাবেন বলে আশা করছি।’



