পদ্মা সেতুর সাড়ে ৩ বছর, টোল আদায় ২,৯৩৬ কোটির বেশি

সাড়ে তিন বছরে পদ্মা সেতু দিয়ে দুই কোটির বেশি যানবাহন পারাপারে টোল আদায় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। তবে ৩০ হাজার কোটির বেশি ব্যয়ের এই প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের চাপ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

গোলাম মঞ্জুরে মাওলা অপু, লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ)

Location :

Munshiganj
পদ্মা সেতু
পদ্মা সেতু |নয়া দিগন্ত

শীতে শান্ত-স্থির আবার কখনো রুদ্র-স্রোতস্বিনী পদ্মার বুক মাড়িয়ে চলতে থাকা যানবাহনগুলো থেকে দিন দিন বাড়ছে পদ্মা সেতুর টোল আয়। গত সাড়ে তিন বছরে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেমসহ সেতুর উভয় প্রান্ত মিলে সর্বমোট টোল আদায় হয়েছে দুই হাজার ৯৩৬ কোটি ১৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। দেশের অন্যতম বৃহৎ এ সেতু টোল-রাজস্বে আশার আলো জাগালেও এ প্রকল্পে রয়েছে দীর্ঘ মেয়াদী ঋণের বোঝা।

শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) নয়া দিগন্তকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের পদ্মা সেতুর সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ নিলয়।

সেতু দিয়ে দূরপাল্লার যানবাহনগুলো চলাচল করছে নির্বিঘ্নে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রবেশদ্বার এ সেতু ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধন হলেও পরদিন ২৬ জুন থেকে শুরু হয় যান চলাচলসহ টোল আদায় কার্যক্রম। সম্প্রতি সেতুতে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেম।

এদিকে সেতু চালুর পরদিন থেকে চলতি বছরের অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত গত সাড়ে তিন বছরে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেমসহ সেতুর উভয় প্রান্ত মিলে সর্বমোট টোল আদায় দুই হাজার ৯৩৬ কোটি ১৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। আর এতে করে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্ত দিয়ে মোট যানবাহন পারপার হয়েছে দুই কোটি ২৯ লাখ ২২ হাজার ৬৭৫টি।

একইসাথে চলতি বছরের এ দিন পর্যন্ত সর্বশেষ গত ছয় মাসে সেতুর উভয়প্রান্ত মিলে ইটিসিএসসহ মোট ৩৪ লাখ ২৭ হাজার ৫৯৮টি যানবাহন পারাপারে মোট টোল আদায় হয়েছে ৪২৫ কোটি ৭৩ লাখ ২৩ হাজার ৯০০টাকা।

পদ্মা সেতুর সাড়ে তিন বছর পদার্পনে টোল এবং ট্রাফিক পরিসংখ্যানের এসব তথ্য তুলে ধরে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ নিলয় জানান, সেতু চালুর পর থেকে চলতি বছরের ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাওয়া ও জাজিরা প্রান্ত দিয়ে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেম বা ইটিসিএস যানবাহনসহ সর্বমোট পারপার করা হয়েছে দুই কোটি ২৯ লাখ ২২ হাজার ৬৭৫টি যানবাহন। এদিন পর্যন্ত সর্বমোট টোল আদায় হয়েছে দুই হাজার ৯৩৬ কোটি ১৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৫০ টাকা। অন্যদিকে ইটিসিএস যানবাহন ব্যতীত সর্বমোট টোল আদায় হয়েছে দুই হাজার ৯৩৪ কোটি ৬৭ লাখ ৯৩ হাজার ৬৫০ টাকা।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের টোল রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, সেতু চালুর প্রথম বছরে অর্থাৎ ২০২২ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২৩ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত মোট ৫৬ লাখ ৯৪ হাজার ৮৯৯টি যানবাহন পার হয় এবং টোল আদায় হয় মোট ৭৯৮ কোটি ৬০ লাখ ৯৩ হাজার ৭০০ টাকা।

দ্বিতীয় বছরে ২০২৩ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২৪ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত মোট যানবাহন পারাপার হয়েছে ৬৮ লাখ এক হাজার ৩৭৪টি এবং মোট টোল আদায় হয়েছে ৮৫০ কোটি ৪৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩৫০ টাকা টোল আদায়ে সক্ষম হয় পদ্মাসেতু কর্তৃপক্ষ।

সেতু চালুর তৃতীয় বছরে অর্থাৎ ২০২৪ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২৫ সালের ২৪জুন পর্যন্ত গত এক বছরে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে মোট যানবাহন পারাপার হয়েছে ৬৯ লাখ ৭৭ হাজার ৩৩৪টি। এ সময় গত রাজস্ব আদায় হয়েছে ৮৫৮ কোটি ৮৭ লাখ দুই হাজার ৫৫০ টাকা।

এতে করে ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধনের পরদিন ২৬ জুন থেকে চলতি বছরের ২৪ জুন পর্যন্ত গত তিন বছরে মাওয়া ও জাজিরা উভয়প্রান্তের টোল প্লাজায় সর্বমোট টোল আদায় হয়েছিলো দুই হাজার ৫০৭ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৬০০ টাকা। এদিন পর্যন্ত মাওয়া ও জাজিরা প্রান্ত দিয়ে ক্রেডিট যানবাহনসহ সর্বমোট পারপার করা হয়েছিলো এক কোটি ৯৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬০৭টি যানবাহন। সেতুর তৃতীয় বছরের শেষ দিকে গেলো জুনে ঈদুল আজহার সময় বেশ কিছু দিন আগের চেয়ে বেড়ে গিয়েছিলো টোল আদায়ের পরিমাণ।

অন্যদিকে সেতু চালুর পর থেকে গেলো ঈদুল আজহায় সেতুর টোল আদায়ে ১ম ও ৫ম রেকর্ড গড়েছে পরপর দুই দিন। গত ৫ জুন ও ৬ জুন পরপর দুইদিন ছিলো সেতুর টোল আদায়ে যথাক্রমে সর্বোচ্চ ১ম ও ৫ম রেকর্ড গড়ে। গেলো ঈদের আগ মুহূর্তে ৫ জুন ২৪ ঘন্টায় পদ্মা সেতুতে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্ত দিয়ে পারাপারের গাড়ির সংখ্যা হয়েছে ৫২ হাজার ৪৮৭টি। যা পদ্মা সেতুর ইতিহাসে সর্বোচ্চ যানবাহন পারাপার। এতে ঐদিন টোল রাজস্বে আয় হয়েছে পাঁচ কোটি ৪৩ লক্ষ ২৮ হাজার টাকা। যা পদ্মা সেতুর টোল আদায়ে এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। এর পরদিনই ৬ জুন ২৪ ঘণ্টায় পদ্মাসেতুতে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্ত দিয়ে পারাপারের গাড়ির সংখ্যা হয়েছে ৪০ হাজার ১১৮টি। এদিন টোল রাজস্বে আয় হয়েছে চার কোটি ৪৭ লক্ষ ৯৪ হাজার ৩০০ টাকা। যা পদ্মা সেতুর ইতিহাসে টোল আদায়ে সর্বোচ্চ পঞ্চম রেকর্ড বলে জানা গেছে।

এর আগে ২০২২ সালের ২৬ জুন সেতু চালু হওয়ার পর একদিনে সর্বোচ্চ টোল আদায়ের রেকর্ড হয়েছিল ২০২৪ সালের ৯ এপ্রিল। ওই দিন মোট ৪৫ হাজার ২০৪টি যানবাহন থেকে চার কোটি ৮৯ লাখ ৯৪ হাজার ৭০০ টাকা টোল আদায় হয়েছিল। একই বছরের ১৪ জুন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টোল আদায়ের রেকর্ড ভেঙে যায়। এদিন ৪৪ হাজার ৩৩টি যানবাহন থেকে টোল আদায় হয়েছে চার কোটি ৮০ লাখ ৩০ হাজার ১০০ টাকা। অন্যদিকে ২০২৩ সালের ২৭ জুন সেতু দিয়ে ৪৩ হাজার ১৩৭টি যানবাহন পারাপার হয়েছিল। এদিন টোল আদায় হয়েছিল চার কোটি ৬০ লাখ ৫৩ হাজার ৩০০ টাকা। যা ছিলো তৃতীয় সর্বোচ্চ টোল।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ২৫ জুন প্রমত্তা পদ্মা নদীর বুকে চালু হয় ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দেশের অন্যতম বৃহৎ পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পটি। প্রকল্পের সর্বশেষ প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ব্যয় সঙ্কোচননীতি অবলম্বন করে সর্বশেষ চূড়ান্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে প্রায় এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। বাকি ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দিয়েছে অর্থ বিভাগ। ঋণ চুক্তি অনুযায়ী এক শতাংশ সুদসহ ৩৫ বছরে ঋণের টাকা ফেরত দেবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। ঋণ পরিশোধের শিডিউল অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরে চারটি কিস্তি করে সর্বমোট ১৪০টি কিস্তিতে সুদ-আসল পরিশোধ করতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে সেতুটির ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে এবং এ ঋণ পরিশোধের জন্য ২০৫৬-৫৭ অর্থবছর পর্যন্ত সময় পাবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।