জ্বালানি তেল সঙ্কট : পাম্প বন্ধ, খুচরা বাজারে ৩ গুণ দামে বিক্রি

জেলার পাম্প মালিকরা ডিপো থেকে সংগৃহীত তেল সরাসরি যানবাহনে বিক্রির পরিবর্তে লাইসেন্সবিহীন খুচরা দোকানগুলোতে ড্রাম, জারকিন বা অন্য পন্থায় বিক্রি করতে বেশি উৎসাহী এবং রাতের আধারে তাদের কাছে বিক্রি করছেন।

নীলফামারী প্রতিনিধি

Location :

Nilphamari
পেট্রল পাম্পে মোটরসাইকেল চালকদের ভিড়
পেট্রল পাম্পে মোটরসাইকেল চালকদের ভিড় |নয়া দিগন্ত

গত এক সপ্তাহ ধরে নীলফামারী জেলার পেট্রল পাম্পগুলোতে তেল সরবরাহ না থাকায় যানবাহন চালক ও সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়েছেন। হাতে গোনা দু’-একটি পাম্পে তেল পাওয়া গেলেও সেখানে মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।

দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে ১০০ বা ২০০ টাকার বেশি তেল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ যানবাহন মালিকদের। তবে কালোবাজারে বেশি মূল্যে তেল বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে সরকার তেল বিক্রিতে রেশনিং পদ্ধতি তুলে নেয়ার পরেও জেলার দু’-একটি পাম্প ছাড়া সকল পাম্প মালিকরা এখনো রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি করায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।

পেট্রল ও অকটেনের তীব্র সঙ্কট চরম আকার ধারণ করেছে। জেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, তেল পাম্পগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না ভোক্তারা। অধিকাংশ পাম্পে ‘তেল নেই’ লেখা নোটিশ ঝুলছে। কোথাও সীমিত সরবরাহ এলেও তা মুহূর্তেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, পাম্পে তেল না মিললেও হাট-বাজারের খুচরা দোকানগুলোতে অবাধেই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে পেট্রল ও অকটেন। প্রতি লিটার পেট্রল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩০০ টাকা এবং অকটেন ৩২০ টাকায়, যেখানে সরকার নির্ধারিত মূল্য যথাক্রমে ১১৬ ও ১২০ টাকা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই সঙ্কট কেবল সরবরাহ ঘাটতির ফল নয়; বরং একটি সঙ্ঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয়ভাবে পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে খুচরা বাজারে অধিক দামে বিক্রি করছে। এতে পাম্পে তেল না পেয়ে বাধ্য হয়ে সাধারণ গ্রাহকদের অতিরিক্ত মূল্যে তেল কিনতে হচ্ছে। তেল সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে জেলার সাধারণ মানুষ।

গাড়ির চালকরা জানান, এক সপ্তাহ ধরে পাম্পে নিয়মিত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। অথচ খুচরা দোকানে দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি দামে তেল সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।

জেলা শহরের মোটরসাইকেল চালক হাবিব বলেন, গত তিন দিন ধরে ছয়টি পাম্প ঘুরে কোথাও তেল পাইনি।

অপরদিকে জেলার কৃষকরা সেচ মৌসুমে তেলের অভাবে জমিতে পানি দিতে পারছেন না। এতে ফসল উৎপাদনে মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তবে পাম্প মালিকরা বলছেন, মূল সমস্যা সরবরাহ সঙ্কট। মেসার্স মোজাম্মেল অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনের মালিক মোজাম্মেল হক জানান, চাহিদার তুলনায় তেল না পাওয়ায় মজুত দ্রুত শেষ হয়ে গেছে। একই কথা বলেন মেসার্স হক ফিলিং স্টেশনের মালিক শামসুল হক। তিনি জানান, সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে তারাও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

তবে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে পাম্প মালিকদের সংগঠন। নীলফামারী জেলা পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ৩৫টি পেট্রল পাম্প রয়েছে এবং কোথাও তেলের প্রকৃত সঙ্কটের খবর পাওয়া যায়নি।

এতে করে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

এদিকে প্রশাসন বলছে, অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে তারা। জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিমা আঞ্জুম সোহানিয়া জানান, অবৈধ মজুত বা অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক অভিযান চালানো হবে। ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সায়লা সাঈদ তন্বীও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক শামসুল আলম বলেন, সরকার নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে জ্বালানি বিক্রি সম্পূর্ণ বেআইনি। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।

জ্বালানী তেলের এ সঙ্কট সৃষ্টির পিছনে পাম্প মালিকদের অব্যাবস্থাপনা ও সিন্ডিকেট অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করেন সাধারণ মানুষ। কেননা জেলার পাম্প মালিকরা ডিপো থেকে সংগৃহীত তেল সরাসরি যানবাহনে বিক্রির পরিবর্তে লাইসেন্সবিহীন খুচরা দোকানগুলোতে ড্রাম, জারকিন বা অন্য পন্থায় বিক্রি করতে বেশি উৎসাহী এবং রাতের আধারে তাদের কাছে বিক্রি করছেন। এসব খুচরা দোকানগুলোতে প্রতি লিটার পেট্রল ও অকটেন বিক্রি হচ্ছে দুই শত টাকা দরে।