খুলনায় এনসিপি নেতাকে গুলির পর বেরিয়ে আসছে অপরাধের নানা কাহিনী

আটক তন্বিসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা

‘আমাদের সংগঠন চাঁদাবাজি করে না। গত রোববার নিজেদের টাকায় আমরা শীতবস্ত্র বিতরণ করেছি।’

এরশাদ আলী, খুলনা ব্যুরো

Location :

Khulna
জাতীয় শ্রমিক শক্তির খুলনা বিভাগীয় আহ্বায়ক মোতালেব শিকদার
জাতীয় শ্রমিক শক্তির খুলনা বিভাগীয় আহ্বায়ক মোতালেব শিকদার |ফাইল ছবি

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক শক্তির খুলনা বিভাগীয় আহ্বায়ক মোতালেব শিকদার গুলিবিদ্ধ হবার পর তিনিসহ একটি চক্রের নামে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এবং নারী ব্যবহার করে অর্থাগমের মধু চক্র পরিচালনার তথ্য সামনে আসছে। এনসিপির সহযোগী সংগঠন জাতীয় যুবশক্তির খুলনা জেলা যুগ্ম-সদস্য সচিব ও মধু চক্রের এক রাণী তানিয়া তন্বিকে আটক করার পর এসব তথ্য জানা গেছে। তাকে সোমবার রাতে আটক করে পুলিশ।

এদিকে মোতালেব গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় তার স্ত্রী ফাহিমা আক্তার মঙ্গলবার দুপুরে তানিয়া তন্বির নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো ৭-৮ জনের বিরুদ্ধে নগরীর সোনাডাঙ্গা থানায় মামলা করেছেন। মামলায় তানিয়া তম্বিকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

মোতালেব শিকদার পেশায় একজন ট্রাকড্রাইভার। হঠাৎ অর্থবিত্ত ও গাড়ি হওয়ার পেছনে বিপুল পরিমাণে চাঁদাবাজির প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। এ বিষয়ে তদন্তে নেমেছে পুলিশ ও র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগ।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের গেয়েন্দা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৈমুর ইসলাম বলেন, গত সোমবার সোনাডাঙ্গা থানা এলাকার আল আকসা মজিদ সরণীর ১০৯ নম্বর রোডের মুক্তা হাউজের নিচ তলায় মোতালেব শিকদারকে গুলির ঘটনায় ডিবি পুলিশ তদন্ত শুরু করে। ঘটনার পর থেকে ওই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা তানিয়া তম্বি আত্মগোপন করেন। পরে মোবাইলফোন ট্রাকিং ও বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে তন্বিকে রাতেই নগরীর টুটপাড়া এলাকা থেকে আটক করা হয়। গুলিকরা অস্ত্রটি উদ্ধারের জন্য তাকে নিয়ে রাতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। তবে অস্ত্রটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, এই তরুণী মধু চক্রের সদস্য। এরা বিভিন্ন সময়ে বিত্তবানদের টার্গেট করে দীর্ঘদিন ধরে নগরীতে চাঁদাবাজি করছেন। এরই ধারাবাহিকতায় মোতালেব শিকদারকে গুলি করা হয়েছে। আমরা অনেক তথ্য পেয়েছি। আশা করি এই চক্রের অন্যান্য সদস্যরাও ধরা পড়বে।

কেএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মাদ তাজুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতার জাতীয় শ্রমিক শক্তির নেত্রী তানিয়া তম্বির ফ্ল্যাটে ঘটে যাওয়া ঘটনায় ৭-৮ জন জড়িত ছিলেন। এরমধ্যে চারজন তন্বির ফ্ল্যাটের মধ্যে এবং তিন-চারজন বাইরে ছিলেন। রোববার রাতে মোতালেব শিকদারকে ওই ফ্ল্যাটে ডেকে নেয়া হয়। সোমবার ভোরে সেখানে ৭-৮ জন উপস্থিত হন। এরমধ্যে চারজন কক্ষের মধ্যে প্রবেশ করেন। তারা কক্ষের মধ্যে প্রবেশ করেই মোতালেব শিকদারকে বলেন- তোর কাছে কাছে ইয়াবা আছে, দে। তার কাছে ইয়াবা নেই বললে তারা কক্ষের মধ্যে ইয়াবা খুঁজে না পেয়ে তার কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। এভাবে কয়েক ঘণ্টা ধরে তার ওপর টাকার জন্য চাপ দেয়া হয়। এরপর পিস্তল দিয়ে তাকে ভয় দেখানো হয়। পরে তার বাম কানে গুলি করা হয়।

তিনি জানান, গ্রেফতার তম্বিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। এই কাজে যারা জড়িত তাদের নাম জানতে পেরেছি। তাদেরকে গ্রেফতারের জোর চেষ্টা চলছে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের পাশাপাশি র‌্যাব, সিআইডি, পিবিআই ছায়া তদন্ত করছে।

তিনি বলেন, পিস্তল দিয়ে মোতালেব শিকদারকে গুলি করা হয়েছে। আমরা ওই পিস্তলটি উদ্ধারের চেষ্টা করছি। ওই ফ্ল্যাটে অসামাজিক কার্যকলাপ হতো। সেখানে নিয়মিত মাদকের আড্ডা বসতো। তানিয়া তম্বি নিজেকে এনজিওতে চাকরি করার কথা বললেও তিনি চাঁদাবাজ চক্রের সদস্য। তার বাড়ি নগরীর ৬৫/৬ হাজী ইসমাইল লিংক রোডে। সে ওই এলাকার আনসার আলীর মেয়ে।

এদিকে গুলিবিদ্ধ মোতালেব শিকদারও একই এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। মোতালেব ১০৯, হাজী ইসমাইল লিঙ্ক রোডের প্রিন্সেস হাউজ ভবনের নিচ তলায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করেন। তারা দুজনই জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনীতির সাথে জড়িত। মোতালেব শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক শক্তির বিভাগীয় আহ্বায়ক এবং তানিয়া তম্বি জাতীয় যুবশক্তির খুলনা জেলা যুগ্ম-সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার দুপুরে মোতালেব শিকদারের স্ত্রী ফাহিমা আক্তার তানিয়া তন্বির নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৭-৮ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।

ট্রাক ড্রাইভার মোতালেব শিকদারের বিত্তবৈভব
মোতালেব শিকদার পেশায় একজন ট্রাকড্রাইভার। ২০০৭ সালে একটি মিনি পিকআপ ভ্যান কেনেন। এই পিকআপ ভ্যান চালিয়ে তার সংসার চলতো। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি খুলনা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বিপ্লবের আস্থাভাজন হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। তার মাধ্যমে খুলনার আলোচিত শেখ বাড়িতে ঢোকার সুযোগ পান মোতালেব। মোতালেব সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই শেখ সোহেলের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন এবং ট্রাক স্ট্যান্ড থেকে তোলা চাঁদার অর্থ ওই বাড়িতে পৌছে দিতেন।

সূত্র জানায়, মোতালেব জাতীয় শ্রমিক লীগের সদস্য হিসেবে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পরাজিত হন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মোতালেবের ভাগ্যে আরো পরিবর্তন ঘটে। তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক শক্তিতে যোগ দিয়ে খুলনা বিভাগীয় আহবায়কের দায়িত্ব পান। এরপর থেকে খুলনা বিভাগের সব রুটে ব্যাপকহারে চাঁদাবাজি করে অঢেল টাকার মালিক বনে যান। এখন তিনি নিজে ট্রাক চালান না।

খুলনা মহানগরীর জিরো পয়েন্ট গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। রূপসা সেতু দিয়ে প্রতিদিন শত শত ট্রাক খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ও মহানগরীতে যাতায়াত করে। জিরো পয়েন্টে প্রতিটি ট্রাক দাঁড় করিয়ে ২০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করে মোতালেব শিকদারের লোকজন। জিরো পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা চাদা আদায় হয়। যার সিংহভাগই যায় মোতালেবের পকেটে।

এছাড়া সোনাডাঙ্গা ট্রাক টার্মিনাল থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করেন মোতালেব শিকদার। এই চাঁদার অর্থ দিয়ে তিনি একটি প্রাইভেটকার কিনেছেন। যেটিকে করে গত রোববার রাতে তিনি তন্বির ডেরায় গিয়েছিলেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে একজন ট্রাকড্রাইভার কিভাবে প্রাইভেটকারে চড়েন।

তবে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে জাতীয় শ্রমিক শক্তির খুলনা জেলা আহ্বায়ক মো: আশরাফুজ্জামান বলেন, আমাদের সংগঠন চাঁদাবাজি করে না। গত রোববার নিজেদের টাকায় আমরা শীতবস্ত্র বিতরণ করেছি। তবে মোতালেব শিকদারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণ গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।