দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি আমের মোকাম চুয়াডাঙ্গার জীবননগর আমবাজারে চলতি মৌসুমে আমের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন আমচাষি ও বাগান মালিকরা। তাদের অভিযোগ, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং পাইকারের স্বল্প উপস্থিতির কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
জেলা সদর ও জীবননগরসহ বিভিন্ন আমবাজার ঘুরে দেখা গেছে, মৌসুমের শুরু থেকেই গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া এবং সীমিত পরিসরে আম্রপালি জাতের আম বাজারে আসতে শুরু করেছে। ভোর থেকেই কৃষকরা আম নিয়ে বাজারে এলেও প্রত্যাশিত সংখ্যক ক্রেতা ও পাইকারের দেখা মিলছে না।
বর্তমানে জীবননগর বাজারে প্রতি মণ (৪৪-৪৫ কেজি) গোপালভোগ আম ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়, হিমসাগর ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়, ল্যাংড়া ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় এবং আম্রপালি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চাষিদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
স্থানীয় আমচাষি বাহালুল হক বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর আমের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত পাইকার না থাকায় বাজারে চাহিদা কম এবং দামও আশানুরূপ নয়। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামে আম বিক্রি করতে হচ্ছে। এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন খরচ তোলাও কঠিন হয়ে পড়বে।
কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল করিম বিশ্বাস বলেন, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু বাজারে দাম কম থাকায় চাষি ও বাগান মালিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। মৌসুমের শুরুতে অন্যান্য বছরের তুলনায় পাইকারের সংখ্যাও কম বলে জানান তিনি।
কৃষি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে অপরিপক্ব আম বাজারে আসায় অনেক ভোক্তা কেনাকাটায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তবে জ্যৈষ্ঠ মাসে পূর্ণ মৌসুম শুরু হলে এবং ঈদ-পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাহিদা বাড়লে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
অন্যদিকে আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের মতে, সাতক্ষীরা, রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গাসহ বিভিন্ন জেলায় প্রায় একই সময়ে আম সংগ্রহ শুরু হওয়ায় বাজারে একযোগে বিপুল সরবরাহ তৈরি হয়েছে। ফলে দাম কমে যাচ্ছে। তারা মনে করেন, বিভিন্ন অঞ্চলে পর্যায়ক্রমে আম সংগ্রহের সময়সূচি নির্ধারণ করা হলে সরবরাহের ভারসাম্য বজায় থাকত এবং কৃষকরা ভালো দাম পেতেন।
তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় ধরে দাম কম থাকলে অনেক চাষি আমচাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন, যা ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের আম উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার জানান, চলতি বছর জেলায় ২ হাজার ২০৩ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ৬৯৭ মেট্রিক টন। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থার ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
আমচাষিদের অভিযোগ, কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা ও শক্তিশালী পাইকারি বিপণন নেটওয়ার্কের অভাবে তারা এখনও ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।



