করোনা মহামারির সময় জরুরি প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে স্থাপন করা হয়েছিল অত্যাধুনিক প্রেসার সুইং অ্যাডসর্পশন (পিএসএ) অক্সিজেন জেনারেটর প্ল্যান্ট। প্রায় দুই কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপিত এই প্ল্যান্ট থেকে ঘণ্টায় প্রায় ৫০০ লিটার বিশুদ্ধ অক্সিজেন উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু চালুর মাত্র ১১ মাসের মাথায় এটি বিকল হয়ে যায়। এরপর কেটে গেছে প্রায় চার বছর। এখনো প্ল্যান্টটি অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে প্রতি মাসে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয় করে তরল অক্সিজেন কিনতে হচ্ছে।
এদিকে, প্ল্যান্টটি মেরামতের জন্য একাধিকবার চিঠি চালাচালি ও বৈঠক হলেও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় বিষয়টি নিয়ে বিপাকে পড়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
চাহিদা ছাড়াই স্থাপন করা হয় প্ল্যান্ট
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) প্রকল্পের আওতায় ঢাকার আনিফকো হেলথ কেয়ার প্রতিষ্ঠান রামেক হাসপাতালে অক্সিজেন প্ল্যান্টটি স্থাপন করে। তবে হাসপাতালের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্ল্যান্টের কোনো চাহিদাপত্র পাঠানো হয়নি।
এর আগে থেকেই হাসপাতালে ভ্যাকুয়াম ইনসুলেটেড (ভিআই) ট্যাঙ্কের মাধ্যমে তরল অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা চালু ছিল। চিকিৎসকদের মতে, বিদ্যমান ব্যবস্থাই হাসপাতালের চাহিদা পূরণে সক্ষম ছিল।
জেনারেটর-টেকনিশিয়ান ছাড়াই চালু
সংশ্লিষ্টরা জানায়, প্ল্যান্ট স্থাপন করা হলেও এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যাকআপ জেনারেটর কিংবা দক্ষ টেকনিশিয়ান দেয়া হয়নি। বিদ্যুৎ চলে গেলে প্ল্যান্ট সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেত এবং পুনরায় চালু করতেও জটিলতা দেখা দিত।
প্রাথমিকভাবে প্ল্যান্টের উৎপাদিত অক্সিজেনকে হাসপাতালের মূল ভিআই ট্যাঙ্ক লাইনের সাথে যুক্ত করার প্রস্তাব দেয়া হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত কারণে তাতে সম্মতি দেয়নি। পরে পরীক্ষামূলকভাবে হাসপাতালের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে প্ল্যান্টটির সংযোগ দেয়া হয়।
১১ মাসেই বিকল, এরপর আর চালু হয়নি
হাসপাতাল সূত্র বলছে, চালুর প্রায় ১১ মাস পর, অর্থাৎ ২০২২ সালের ১৬ আগস্টের পর থেকেই প্ল্যান্টটি সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। এরপর বিভিন্ন সময়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে মেরামতের জন্য জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে কোটি টাকার যন্ত্রটি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে কার্যত সরকারি অর্থের অপচয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
মন্ত্রণালয়ের নজরে বিষয়টি
অচল প্ল্যান্টের বিষয়টি সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নজরে এসেছে। ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বিশ্বস্বাস্থ্য-২ শাখা থেকে রামেক হাসপাতালের পরিচালকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়, গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে স্থাপিত পিএসএ/ভিএসএ অক্সিজেন প্ল্যান্টগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়নে ইউনাইটেড ন্যাশনস অফিস ফর প্রজেক্ট সার্ভিসেস (ইউএনওপিএস)-বাংলাদেশ একটি কারিগরি দল গঠন করেছে।
চিঠিতে সংশ্লিষ্ট টিমকে হাসপাতাল পরিদর্শন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র, রক্ষণাবেক্ষণের তথ্য ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সহযোগিতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়া হয়।
চিঠি দিয়েও মিলছে না সমাধান
রামেক হাসপাতালের একটি সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি মন্ত্রণালয় থেকে প্ল্যান্টটির বর্তমান অবস্থা জানতে চাওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী সিএমএসডিকে জানানো হয়েছে যে প্ল্যান্টটি দীর্ঘদিন ধরে অচল রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে এ বিষয়ে একটি জুম সভা অনুষ্ঠিত হয়। তখন হাসপাতালের পরিচালক জানান, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা কয়েকবার সরেজমিনে এসে প্ল্যান্ট পরিদর্শনও করেছে এবং মেরামতের আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
মাসে অর্ধকোটি টাকার অক্সিজেন কিনতে হচ্ছে
হাসপাতালে প্রতিদিন শত শত রোগীর চিকিৎসায় অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। প্ল্যান্টটি সচল থাকলে এই ব্যয়ের একটি বড় অংশ সাশ্রয় করা সম্ভব হতো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু যন্ত্রটি অচল থাকায় এখনো প্রতি মাসে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে তরল অক্সিজেন কিনতে হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতা নিয়ে
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, হাসপাতালের প্রয়োজন ও বাস্তবতা যাচাই না করে ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি স্থাপন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল নিশ্চিত না করা এবং পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের অভাব—সব মিলিয়ে এই প্রকল্প এখন কার্যত ব্যর্থতার উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি অর্থে কেনা সোয়া দুই কোটি টাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রায় চার বছর ধরে অচল পড়ে থাকলেও এর দায় কার, কেনো এখন পর্যন্ত মেরামত হয়নি এবং এ ব্যর্থতার জন্য কারা জবাবদিহি করবেন—এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত প্ল্যান্টটি সচল করা না গেলে শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ই নয়, ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য অবকাঠামো পরিকল্পনা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠবে।
এ বিষয়ে জানতে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পিকে এম মাসুদ উল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
একইভাবে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা: মো: আবু তালেবের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) এস এম রাশিদুস সালেকিন সুমনের সাথেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনিও কল রিসিভ করেননি।
তবে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা: হাসানুল হাছিব এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি হাসপাতালের মুখপাত্রের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ডা: শংকর কে বিশ্বাস ইতোমধ্যে অন্য কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো মুখপাত্র নিয়োগ দেয়া হয়নি।



