গ্রামের বাড়ির আঙিনা, বসতভিটা কিংবা জমির পাশে বেড়ে ওঠা গাছকে শুধু পরিবেশের সুরক্ষা নয়; জলবায়ু অর্থনীতির সম্ভাব্য সম্পদ হিসেবে কাজে লাগানোর অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গাকৃবি) শিক্ষার্থীদের দল ‘কার্বডিট’ (CARBODIT)। গ্রামীণ পরিবারের গাছকে পরিমাপযোগ্য কার্বন সম্পদে রূপান্তর করে বৈশ্বিক কার্বন বাজার ও জলবায়ু অর্থায়নের সাথে যুক্ত করার এই ধারণা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
CIRDAP-REEDS International Rural Development Innovation Challenge-২০২৬ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হয়েছে দলটি। একইসাথে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের নির্বাচিত সেরা পাঁচ উদ্ভাবনের একটি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে ‘কার্বডিট’।
আন্তর্জাতিক এ প্রতিযোগিতায় ১৩টি দেশ থেকে মোট ১৮৭টি উদ্ভাবনী প্রস্তাব জমা পড়ে। আন্তর্জাতিক বিচারক কমিটির কঠোর ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেরা উদ্ভাবনগুলো নির্বাচন করা হয়।
৬ জুলাই সিরডাপের ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে কার্বডিট দলের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পুরস্কার প্রদান করেন তৎকালীন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
কার্বডিট দলের টিম লিডার সাইফুল্লাহ মানওয়ার। তিনি একইসাথে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা। প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে রয়েছেন ফাবিয়ান তাসকিন। অদিতি ঘোষ প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) এবং আরফা সাইয়ারা রিজা ডেভেলপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এ সাফল্যের পর আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের উদ্ভাবন তুলে ধরার আরো বড় সুযোগ পেয়েছেন গাকৃবির এ তরুণ উদ্ভাবকরা। আগামী ৬-১০ অক্টোবর শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় অনুষ্ঠিত হবে ‘এশিয়া প্যাসিফিক কনফারেন্স অন ইনোভেশনস ইন রুর্যাল ডেভেলপমেন্ট’। সম্মেলনে কার্বডিটের উদ্ভাবন উপস্থাপনের জন্য দলটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও উদ্ভাবকদের সামনে বাংলাদেশের গ্রামীণ বাস্তবতার আলোকে তৈরি এ মডেল তুলে ধরবেন তারা।
‘CARBODIT: A Community-Based Digital Carbon Finance Model for Rural Empowerment’ উদ্ভাবনের মূল লক্ষ্য গ্রামীণ পরিবারের মালিকানাধীন গাছকে সমষ্টিগতভাবে পরিমাপযোগ্য কার্বন সম্পদে রূপান্তর করা। এ সম্পদকে বৈশ্বিক কার্বন বাজার ও জলবায়ু অর্থায়নের সাথে যুক্ত করার মাধ্যমে গাছের মালিকদের পরিবেশগত অবদানের আর্থিক মূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
উদ্যোগটির আওতায় স্থানীয় তরুণদের সম্পৃক্ত করে গাছের তথ্য সংগ্রহ, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং কার্বন সম্পদ তৈরির জন্য একটি কমিউনিটি-ভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে একদিকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর পরিবেশগত ভূমিকার অর্থনৈতিক মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে স্থানীয় তরুণদের জন্যও নতুন কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
গাকৃবির শিক্ষার্থীদের এ অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘গাকৃবি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন র্যাঙ্কিংয়ে জাতীয় পর্যায়ে শীর্ষস্থান এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে গৌরবময় অবস্থান অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এ অর্জনের অন্যতম অংশীদার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গাকৃবির সব অর্জন মূলত শিক্ষার্থীদের গুণগত উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়।’ তিনি শিক্ষার্থীদের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেন।
কার্বডিটের এ সাফল্যকে শুধু একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, গ্রামীণ মানুষের সম্পদ ও স্থানীয় তরুণদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের স্থানীয় সমাধান খোঁজার সম্ভাবনাই এ উদ্যোগের সবচেয়ে বড় দিক। একইসাথে এটি বাংলাদেশের তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি ও গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনাকেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরেছে।



