ইট-কংক্রিটের নগর জীবনের কোলাহল পেছনে ফেলে ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে প্রকৃতির টানে সিলেটে ভিড় জমিয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লাখো পর্যটক। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি সিলেট যেন এখন উৎসবমুখর এক পর্যটন নগরী।
স্বচ্ছ জলরাশির সাদাপাথর, রাতারগুলের জলাবন, জাফলংয়ের মেঘমালা ও বিস্তীর্ণ চা বাগানের সবুজে মুগ্ধ হয়ে পড়ছেন ভ্রমণপিপাসুরা। সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো ছুটির আনন্দে মাতোয়ারা ভ্রমণপিপাসুদের উৎসবমঞ্চে পরিণত হয়েছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য আধার সিলেট ও মৌলভীবাজার। ব্যস্ত নগর জীবনের কোলাহল থেকে দূরে এই দুই জেলার নীরব প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে আছে ভিন্ন এক আনন্দ। দুই জেলায় যতদূর চোখ যায়, দেখা মেলে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ আর সবুজে মোড়া চা বাগানের অপরূপ বিস্তার। চা বাগানের সবুজ প্রকৃতি, পাহাড়ি ঝর্ণা, সাদা পাথরের নীল জলরাশি আর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের প্রেমে পড়েন যে কেউই।
এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, যা ব্যস্ততার ভিড়ে মানুষকে মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। নতুন করে যেন প্রাণশক্তির সঞ্চার করে। সেই মানসিক প্রশান্তির খুঁজেই এবারের ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সিলেট ও মৌলভীবাজার ঘুরে বেড়াচ্ছেন কয়েক লাখ পর্যটক। চা বাগানের সবুজ প্রকৃতি আর সাদা পাথরের নীল জলরাশিতে বিমোহিত পর্যটকরা। প্রতিটি পর্যটন স্পট যেন উৎসবের নগরী হয়ে উঠে।
চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপার ভাণ্ডার। পুরো এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে এক অনন্য শান্ত পরিবেশ, যা মুহূর্তেই পর্যটকের মনকে প্রশান্ত করে তোলে। এই আঁকাবাঁকা সরু পথ ধরে সকালে চা বাগানে ঘুরে বেড়ানো সত্যিই এক মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা। সকালের মৃদু ঠাণ্ডা বাতাসে ভেসে আসে তাজা চা পাতার মিষ্টি ঘ্রাণ, আর এর ওপর যখন রোদ এসে পড়ে পাতাগুলো চকচক করতে থাকে।
এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘুরতে ঘুরতে অনেক সময় বানর, বিরল প্রজাতির নানা পাখি ও গাছেরও দেখা মেলে। এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যগুলো আমাদের বেঁচে থাকার জন্য নতুনভাবে যেন রিচার্জ করতে থাকে।
এবারের ঈদের ছুটিতে শ্রীমঙ্গলের চা বাগান, হাই হাওর, বাইক্কা বিল, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, কুলাউড়ার মুরইছড়া ইকো পার্ক, আমানীপুর পার্ক, এইচআরসি ও ইস্পাহানীর চা বাগান, বড়লেখার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত ও চা বাগানগুলোতে অন্তত পাঁচ লাখ পর্যটকের সমাগম হয়েছে বলে জানিয়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। পর্যটকদের আগামন ঘিরে চাঙা জেলার পর্যটন শিল্প। ফাইভ স্টার হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও ইকো ভিলেজগুলো ছিল পর্যটকে ঠাঁসা।
সিলেট শহর থেকে মাধবপুর লেকে ঘুরতে আসা লাবনী তুলি বলেন, ‘শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনন্য। এখানকার চা বাগান ও আঁকাবাকা পাহাড়ি পথ আমাকে মুগ্ধ করে।’
ঢাকার গুলশানের বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ইউনিক। এখানকার প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য অসাধারণ। তাই ছুটি কাটাতে শ্রীমঙ্গলকেই বেছে নিয়েছি। পুরো পরিবারকে নিয়ে ঘুরতে এসেছি মৌলভীবাজার জেলায়।’
জনাকীর্ণ শহর থেকে দূরে প্রকৃতির মাঝে শান্তিপূর্ণ মুহূর্ত উপভোগ করতে দীর্ঘ ছুটিতে প্রকৃতির টানে সিলেটেও ভিড় জমিয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লাখো পর্যটক। সাদা পাথরের নীল জলরাশি, সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুলের জলারবন, মেঘের রাজ্য জাফলংয়ের সুউচ্চ পাহাড়ি ঝর্ণা, বিছনাকান্দির সবুজ জলরাশি ও পাথর এবং বিভিন্ন চা বাগানের সবুজ প্রকৃতিতে মুগ্ধ হয়ে পড়ছেন সিলেটে ঘুরতে আসা ভ্রমণপিপাসুরা।
ঈদুল ফিতরের দিন শনিবার (২১ মার্চ) থেকে আজ মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) পর্যন্ত সিলেটের সবগুলো স্পটই ছিল উৎসবমুখর। ছুটিতে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ সাদা পাথরে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভ্রমণে আসা মানুষের ঢল নামে। পাহাড়ঘেরা স্বচ্ছ পানির পাথুরে নদীতে আনন্দে মেতে ওঠেন পর্যটকরা, নদীতে তিল ধারণেরও ঠাঁই ছিল না।
শুধু সাদা পাথর নয়; জাফলং, বিছানাকান্দি, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, পান্তুমাই, ডিবির হাওরসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটেও ছিল একই চিত্র। পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলধারা, বিছানাকান্দির পাথুরে প্রান্তর ও পাহাড়ি ঝরনা, আর রাতারগুলের অনন্য জলাবন পর্যটকদের মুগ্ধ করে তোলে। প্রতিটি স্পট যেন রূপ নেয় এক একটি উৎসবমঞ্চে।
ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা জান্নাতুল মাওয়া সায়মা বলেন, ‘সিলেটের প্রকৃতি যেন সৃষ্টিকর্তার বিশেষ উপহার। এ সৌন্দর্য অন্য কোথাও খুব কমই দেখা যায়।’
কুমিল্লা থেকে আসা পর্যটক সানজিদা হ্যাপী বলেন, ‘সারাবছরের কর্মব্যস্ততার পর ঈদের ছুটিতে একটু স্বস্তি খুঁজতেই এখানে আসা। সিলেটের প্রতিটি পর্যটন স্পটই দারুণ।’
কুষ্টিয়া থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে আসা জামিরুল ইসলাম বলেন, ‘সিলেটের প্রকৃতি আমাকে সবসময় মুগ্ধ করে। তাই ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছি।’
পর্যটকদের আগমনে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতি। নৌকার মাঝি আবুল লেইছ জানান, ঈদের আগে আয় কম ছিল, এখন পর্যটক বাড়ায় প্রতিদিন ভালো আয় হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল হাসিম বলেন, ঈদের দিন থেকেই দোকানে ভিড় বেড়েছে। পানি, খাবার ও স্থানীয় পণ্যের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সিলেটের পর্যটনে নতুন করে অফূরন্ত সম্ভাবনা দেখছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা
সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মুহাম্মদ সারওয়ার আলম বলেন, ‘অনুকূল আবহাওয়া ও পরিবেশের কারণে এ বছর পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।’
এদিকে রোববার (২২ মার্চ) বিকেলে সাদা পাথর পর্যটনকেন্দ্র পরিদর্শন করেন সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি পর্যটকদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং সাদা পাথরকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে করণীয় বিষয়ে মতামত নেন। এ সময় অতিরিক্ত নৌভাড়া আদায়ের অভিযোগে কয়েকজনকে জরিমানাও করা হয়।
মন্ত্রী বলেন, ‘সিলেটের পর্যটন স্পটগুলোকে আরো আকর্ষণীয় করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের নিয়ম মেনে চলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ জাফলং জোনের ইনচার্জ তপন তালুকদার বলেন, পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা অনিয়ম ঠেকাতে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে ঈদের ছুটিতে সিলেট নগরীর চা বাগানগুলোতেও উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। বিশেষ করে লাক্কাতুরা ও মালনিছড়া চা বাগানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সবুজের মাঝে সময় কাটাতে ভিড় করেন হাজারো মানুষ।
ট্যুরিস্ট পুলিশ সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার উৎপল কুমার চৌধুরী জানান, পর্যটন স্পটগুলোতে সার্বক্ষণিক টহল জোরদার করা হয়েছে এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।



