সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া এখন যেন সরিষার হলুদেমোড়া এক বিস্তীর্ণ ক্যানভাস। দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে ফোটা সরিষা ফুলের মৌ মৌ গন্ধে মুখরিত চারপাশ। এ হলুদ চাদরের মাঝেই কর্মচঞ্চল সময় পার করছেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শতাধিক মৌ চাষি। সরিষার ফুলের ওপর নির্ভর করে এ বছর উল্লাপাড়ায় প্রায় ২০০ মেট্রিক টন মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা পর্যায়ে সরিষা উৎপাদনে উল্লাপাড়া দেশের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। চলতি মৌসুমে এখানে ২৪ হাজার ৫৭ একর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ৪৩ হাজার ৫৮ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। বিপুল এ সরিষা ক্ষেতই প্রতিবছর উল্লাপাড়াকে পরিণত করে মৌ চাষিদের মিলনমেলায়।
সরিষার ফুল ফোটার সাথে সাথে সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা, নড়াইলসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মৌ চাষিরা উল্লাপাড়ায় ছুটে এসেছেন। বর্তমানে উপজেলার উধুনিয়া, বড় পাঙ্গাসী, লাহিড়ী মোহনপুর, সলঙ্গাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠে ১০ হাজারের বেশি মৌ বাক্স স্থাপন করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের ধারণা, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে খামারির সংখ্যা আরো বাড়বে এবং মৌ বাক্সের সংখ্যা ১৪ হাজারে পৌঁছাতে পারে।
যশোর থেকে আসা মৌ চাষি আমিরুল ইসলাম উল্লাপাড়ার বাগমারা মাঠে ৩০০টি মৌ বাক্স বসিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে— অতিরিক্ত কুয়াশা বা তীব্র শীত না পড়লে— এবার আমি চার হাজার ৫০০ কেজির বেশি মধু সংগ্রহ করতে পারব বলে আশা করছি।’
একই প্রত্যাশা সাতক্ষীরার মৌ চাষি পলাশ ও স্থানীয় খামারি রাকিব হোসেনের। রাকিব বলেন, ‘আমি ২০০টি বাক্স থেকে প্রায় তিন হাজার কেজি মধু পাওয়ার আশা করছি। গত পাঁচ বছর ধরে এখানে মধু সংগ্রহ করছি, প্রতিবারই ভালো লাভ হয়েছে।’
মৌ চাষিদের হিসাবে বড় ও ছোট ভেদে প্রতিটি বাক্স থেকে গড়ে ১৩ থেকে ১৫ কেজি মধু পাওয়া যায়। উল্লাপাড়ার মৌ চাষিদের জন্য এবার বাড়তি সুখবর হয়ে এসেছে লাহিড়ী মোহনপুরে স্থাপিত মধু প্রসেসিং প্ল্যান্ট। জাইকার অর্থায়নে নির্মিত এ আধুনিক প্ল্যান্টে প্রতিদিন প্রায় এক মেট্রিক টন মধু রিফাইন বা প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে।
উপজেলা মৌ চাষি সমবায় সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান শিহাব ও সাধারণ সম্পাদক ছোরমান আলী জানান, আগে মধু প্রক্রিয়াজাত করতে চাষিদের দূরবর্তী এলাকায় যেতে হতো, এতে সময় ও অর্থ— দুটোই বেশি ব্যয় হতো। এখন নিজ উপজেলাতেই আধুনিক প্ল্যান্ট থাকায় খরচ কমছে, মান বজায় থাকছে এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে।
উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন সুমী বলেন, ‘উল্লাপাড়া সরিষা চাষে দেশের শীর্ষ উপজেলা। এখানকার আবহাওয়া ও সরিষার ফুল মধু উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। চলতি মৌসুমে প্রায় ২০০ মেট্রিক টন মধু উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার বাজারমূল্য সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকা হতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘মধু প্রসেসিং প্ল্যান্ট চালু হওয়ায় চাষিরা এখন মানসম্মত মধু উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারছেন, যা তাদের আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’



