প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে প্রবাসীদের পাঠানো হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্সে জমকালো হয়ে উঠেছে ঈদ বাজার। মার্চের ১১ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৯২ কোটি ডলার। তার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রেমিট্যান্স সিলেটে এসেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা। এই রেমিট্যান্সের ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে সিলেটের ঈদ বাজারে।
নগরের জিন্দাবাজার, কুমারপাড়া, নয়া সড়ক, দরগা গেট, আম্বরখানা ও সোবহানীঘাট এলাকার ফ্যাশন হাউস ও লাইফ স্টাইল পণ্যের শো-রুমগুলোতে এখন চলে দিনরাত কেনা-বেচা। ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়ে দম ফেলার ফুসরত নেই বিক্রেতাদের। ঈদ ঘনিয়ে আসায় পুরো রাত জেগে থাকে সিলেট নগরী। ঈদুল ফিতর ঘিরে সিলেট যেন এখন উৎসবের নগরী।
সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ঈদ বাজারে দৈনিক অর্ধশত কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে জানিয়েছেন সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির কর্মকর্তারা। বিক্রেতারা বলছেন, চাঁদ রাত পর্যন্ত এ বেচা-কেনা চলবে। এই ঈদে আধুনিক ও রুচিশীল পোশাকেই বেশি পছন্দ ক্রেতাদের। মহিলাদের বাহারি রকমের ড্রেস আর পুরুষদের পাঞ্জাবির চাহিদা বেশি ঈদ বাজারে।
নগরীর নয়াসড়ক, কুমার পাড়া, আম্বরখানার ফ্যাশন হাউসে ধনাঢ্য ক্রেতাদের ভীড় বেশি। আর শুকরিয়া, লতিফ সেন্টার, মধুবন ও হাসান মার্কেটে ছুটে চলেন মধ্যবিত্তরা।
শুক্রবার ও শনিবার বাজার ঘুরে দেখা গেছে নগরীর পূর্ব জিন্দাবাজার, নয়াসড়ক ও কুমারপাড়া এলাকায় আড়ং, ইয়েলো, সেইলর, আর্টিসান, ইজি, ইনফিনিটি, রিচম্যান, মাহা, নবরুপা, শী, চন্দ্রবিন্দু ও শৈল্পিকসহ নামি-দামি ব্র্যান্ডের দোকানে নানা বয়সী মানুষ কেনাকাটা করতে এসেছেন। এসব ফ্যাশন হাউসে পা ফেলার জায়গা নেই। চলছে কেনাকাটার মহাধুম। বিক্রয়কর্মীদেরও যেন ক্লান্তি নেই। সকাল ১১টা থেকে সাহরির-পূর্ব পর্যন্ত চলে বেচা-কেনা।
জেল রোডের আড়ং এখন দিনরাতই সমান। দেশের শীর্ষ এই ব্র্যান্ডে শিশু থেকে বৃদ্ধ সব শ্রেণীর মানুষই কেনাকাটা করতে আসেন। সময়ের সাথে প্রতি ঈদেই নতুন ডিজাইনের পাঞ্জাবি, থ্রী-পিসসহ সবধরনের ড্রেস নিয়ে আসে আড়ং।
আড়ংয়ের বিক্রয় কর্মী কামরুন্নাহার চৌধুরী বলেন, ‘আড়ংয়ে সববয়সী মানুষের পোশাক রয়েছে। শাড়ি, থ্রী-পিস, পাঞ্জাবি ও শিশুদের ড্রেসের চাহিদা বেশি।’
নয়াসড়কের চন্দ্রবিন্দুর সেলস এক্সিকিউটিভ সাদিয়া আফরিন আশা বলেন, ‘সিলেটের মানুষ ফ্যাশন সৌখিন। এটাকে প্রায়োরিটি দিয়েই আমরা শো-রুম সাজিয়েছি। ঈদে সাহরি পর্যন্ত বেচা-কেনা চলে।’
ছোটদের ঈদের পোশাক সম্পর্কে বেবি শপের বিক্রয় কর্মী নাজমুন্নাহার জানান, ‘এবার ঈদ কালেকশনে ছোটদের পোশাকে আনা হয়েছে নতুনত্ব। এবারের মূল লক্ষ্য হলো বাহারি সব আরামদায়ক পোশাক। প্যাটার্ন ও মোটিফের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে ব্লক প্রিন্ট, ফুলেল নকশার সাথে কিছু কার্টুন থিমের প্রিন্ট। সব মিলিয়ে শিশুর আরামের পাশাপাশি উৎসবের আমেজও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।’
বিক্রেতারা জানান, ছেলে শিশুদের পোশাকে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে পাঞ্জাবি ও ফতুয়া। এসব পোশাকে এবার ব্যবহার হচ্ছে জ্যামিতিক প্রিন্ট, চেক, স্ট্রাইপ, ফুলেল ব্লক প্রিন্ট ও ঐতিহ্যবাহী মোটিফ। কলার, কাফ ও বুকে কনট্রাস্ট পাইপিং বা সূচিকর্মের কাজ যুক্ত করে নতুনত্ব আনা হয়েছে। সেইসাথে কাঠের বোতাম, হ্যান্ডমেইড টার্সেল কিংবা ছোট্ট এমব্রয়ডারি প্যাঁচ পোশাককে করে তুলছে আকর্ষণীয়। অনেক পাঞ্জাবিতে দেখা যাচ্ছে ডিজিটাল প্রিন্টের ব্যবহার, যেখানে হালকা রঙের ওপর সূক্ষ্ম নকশা ফুটে উঠছে। আবার অ্যাসিমেট্রিক কাট কিংবা শর্ট লেংথ ফতুয়ার চল বেড়েছে। পাশাপাশি ম্যাচিং জ্যাকেট বা ওয়েস্টকোট যুক্ত করে তৈরি হচ্ছে ফিউশন স্টাইল।
মেয়ে শিশুদের ঈদের পোশাকের বৈচিত্র্য আরো বিস্তৃত। দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোয় মিলছে মেয়েদের বাহারি কাটছাঁটের পোশাক। ফ্রকের সাথে সারারা, গাউন, লেহেঙ্গা কিংবা সালোয়ার-কামিজে ফুলেল নকশা এখন শীর্ষে। টিউলিপ, গোলাপ, সূর্যমুখী কিংবা ছোট ছোট বুনো ফুলের প্রিন্ট শিশুর পোশাকে এনে দিচ্ছে প্রাণচাঞ্চল্য। এ ছাড়া পোলকা ডট, টাই-ডাই, অ্যাবস্ট্রাক্ট প্রিন্ট, কার্টুন মোটিফ ও রূপকথা-প্রেরিত ডিজাইনও বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করছে।
সুতি ছাড়াও মিলছে সিল্ক, লিনেন, ভিসকস, মসলিন কাপড়ের পোশাক। লেইস, নেট ও অরগাঞ্জা কাপড়ে লেয়ারিং প্যাটার্ন ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে ঘেরওয়ালা ফ্রক, নায়রা কাট, কটি ফ্রক। যা শিশুর সাজে যোগ করছে রাজকীয়তা। এ ছাড়া লেহেঙ্গার আদলে রেডিমেইড শাড়িও বেশ নজর কাড়ছে।
নয়াসড়ক ও কুমারপাড়া ছাড়াও নগরীর আল হামরা শপিং সিটি, সিটি সেন্টার, ব্লু ওয়াটার শপিং মল, সিলেট মিলিনিয়াম, লতিফ সেন্টার ও শুকরিয়া মার্কেটের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গ্রাহকের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। এসব শপিং মলে নগরের বড় একটি অংশের মানুষ শপিং করে থাকেন। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নানা বয়সী মানুষ কেনাকাটা করতে এসেছেন। ইফতারের পর থেকে জিন্দাবাজার যেন জনসমুদ্র হয়ে উঠে। সড়ক আর শপিং মল মিলে একাকার হয়ে উঠে। মানুষের ভিড়ে জিন্দাবাজার জেগে থাকে গভীর রাত পর্যন্ত।
ক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ এবার ঈদের কেনাকাটায় মূলত সন্তানদের পোশাকের গুণমানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। বাচ্চাদের পছন্দের পোশাক কিনতে তারা শপিং মলগুলোতে ছুটলেও নিজেদের প্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য বেছে নিচ্ছেন ফুটপাত।
আল হামরা শপিং সিটিতে কেনাকাটা করতে আসা সরকারি কর্মকর্তা বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘দুই ছেলের জন্য পাঞ্জাবি, পায়জামা, ফতোয়া ও জুতা কিনেছি। পরিবারের বাকিদের কেনাকাটা এখনও হয়নি।’
শপিং মলের বাইরে লালদিঘি হকার্স মার্কেট ও হাসান মার্কেটের দোকানগুলোতেও ভিড় করছেন এক শ্রেণীর গ্রাহক। হকার্স মার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা সাদিক-ফাবেহা দম্পতি সন্তানদের জন্য মার্কেটের ভেতর থেকে কেনাকাটা করলেও নিজেদের জন্য তারা ফুটপাতের দোকানে পণ্য খুঁজছেন।
সাদিক বলেন, ‘পোশাকের দাম এবার অনেক বেশি। দুই সন্তানের জন্য তিন হাজার টাকা বাজেট থাকলেও খরচ হয়ে গেছে পাঁচ হাজার টাকারও বেশি। তাই এখন স্ত্রীর থ্রি-পিস আর নিজের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সাধ্যের মধ্যে ফুটপাত থেকেই কেনার চেষ্টা করছি।’
এদিকে শুক্রবার ও শনিবার হালকা বৃষ্টিপাত হলেও বাজারে সেটা তেমন কোনো প্রভাব ফেলেনি বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
এদিকে ঈদ ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অপরাধী চক্র। ছিনতাই ঠেকাতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ নগরীর ব্যস্ত এলাকায় ফোর্স মোতায়েন করেছে।
সার্বিক বিষয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) এডিসি (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘নগরবাসীকে কেনাকাটায় স্বস্তি দিতে প্রতিটি শপিং মলে পুলিশের ফোর্স কাজ করছে। এছাড়া সিভিল পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশও কাজ করছে। অপরাধ দমনে কোনো ছাড় দেয়া হবে না।



