রংপুরে ফোর মার্ডারে শার্টকাণ্ড : পুলিশ কর্মকর্তার দাবি কাকতালীয়

পুলিশের দাবি বিষয়টি কাকতালীয়। কিন্তু অভিযুক্তের বাবা দাবি ভিন্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ঝড় চলছে।

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর ব্যুরো

Location :

Rangpur
পুলিশ সদস্য ও আসামি একই ডিজাইনের শার্ট পরে আছেন
পুলিশ সদস্য ও আসামি একই ডিজাইনের শার্ট পরে আছেন |নয়া দিগন্ত

রংপুরে চাঞ্চল্যকর শিক্ষক পরিবারে চার সদস্য খুনের ঘটনায় গ্রেফতার সিদ্ধার্থ দাসের পরনের শার্টের সাথে মহানগর উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তির শার্টের মিল থাকার বিষয়টি কাকতালীয় বলেছেন ওই ‍পুলিশ কর্মকর্তা। অন্যদিকে সিদ্ধার্থের বাবা জানান, গ্রেফতারের সময় তার ছেলে একটি ঘিয়ে রংয়ের গেজ্ঞি পরা ছিল।

গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) ভোরে নগরীর মাছূয়াপাড়া এলাকার নিজ বাড়িতে খুন হন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তি, তার স্ত্রী প্রিতিলতা চক্রবর্তি, ছেলে জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়ুশ ওরফে প্রিয়ম চক্রবর্তি ও মেয়ে কারমাইকেল কলেজ থেকে সদ্য ইংরেজি বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাশ করা আগামী ওরফে প্রার্থী চক্রবর্তি। শনিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে রোববার ভোর ৫টা পর্যন্ত সময় ধরে পুলিশ তাদের লাশ উদ্ধার করে।

এ ঘটনায় রোববার ভোরেই একই এলাকার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস নামে দুইজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওইদিন দুপুরে তাদেরকে ডিবি অফিসে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মহানগর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে আনা হয়। এরপর সেখানে ব্রিফিং করেন মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। তারপর রাত ১১টা পর্যন্ত তারা রংপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক রফিকুল ইসলামের কাছে ১৬৬ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

চার খুনের লাশ উদ্ধারের পুরোটা সময় মহানগর উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর গায়ে যে ধরনের শার্ট দেখা যায় ঠিক গ্রেফতার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে রোববার দুপুরে যখন মহানগর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে আনা হয় এবং যখন রাতে আদালতে তোলা হয় তখন সিদ্ধার্থের গায়েও হুবুহু একই ধরনের একই রংয়েরে শার্ট দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই তাদের ফেসবুকে সিদ্ধার্থ ও উপ-পুলিশ কমিশনারের ছবি দিয়ে একই শার্ট কিভাবে দুইজনের গায়ে আসলো তা জানতে চান। অনেকেই এটাকে নানাভাবে ফ্রেমিং করেন। তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার কথাও বলেন। তুমুল আলোচনা তৈরি হলেও বিষয়টি খোলাসা হচ্ছিল না।

বিষয়টি নিয়ে সোমবার মাছুয়া পাড়ার সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাসের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ‘আমি ওই ধরনের শার্ট গ্রেফতার হওয়ার আগে কখনোই আমার ছেলের গায়ে দেখিনি। যখন আমার ছেলে পুলিশের সাথে চলে গেছে তখন ঘিয়ে কালারের একটা গেঞ্জি গায়ে দিয়ে গেছে। আর এখন ওর গায়ে যেটা দেখেছি, এটা তো আমরা চিনি না। বাড়ির অন্য শার্টগুলোও মোটামুটি সব চিনি। কিন্তু এই তো আমরা চিনি না। ওর গায়ে ওই ধরণের শার্টটা কখনো দেখিনি। গেঞ্জি গায়ে দিয়ে গেছে। ওটা তো ওখানকার শার্ট। ওই শার্টটা তো কখনো আমরা দেখিনি।’

এ বিষয়ে রংপুর মহানগর উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তি জানান, ‘আমার এই শার্টকাণ্ড সম্পর্কে আসলে খুব বেশি কিছু বলার নেই। এটা কাকতালীয়। আমার এটা আড়ংয়ের শার্ট। একই ব্র্যান্ডের, একই কালার কম্পোজিশনের শার্ট আড়ং নিশ্চয়ই একটা তৈরি করেনি।’

তিনি বলেন, ‘সিদ্ধার্থকে যখন অরেস্ট করা হয়, তখন আমার অফিসে যে ছবি তোলা হয়েছে, আমি আপনাকে সে ছবিও দেখাতে পারি। সেখানেও সে ওই শার্ট পরে ছিল। তখন আমি কেবল মাঠ থেকে এসেছি, ওখানে আপনারা আমাকে দেখেছেন। আসলে এই বিষয়টা ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। তারপরেও বলবো, আমার শার্ট আমার কাছেই আছে এবং আপনি দেখতেই পাচ্ছেন আমি এটা এখন পরে আছি।’

সিদ্ধার্থের বাবা বলছে গ্রেফতারের সময় সিদ্ধার্থ একটা ঘিয়ে রঙের গেঞ্জি পরে ছিল, ওরকম শার্ট তার নেই এমন প্রশ্নের উত্তরে সনাতন চক্রবর্তি বলেন, ‘আসলে তার বাবা তো বলছে তার ছেলেও নির্দোষ। তার ছেলে কোনো ঘটনা ঘটায়নি। কিন্তু তার ছেলেতো আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাহলে সেটার কি হলো।’

পুলিশ কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তি দু’টি ছবি দেন। তাতে দেখা যায় রোববার ডিবি অফিসে ভোর ৫টা ৫৮ মিনিটে তোলা।

তবে বিষয়টি নিয়ে পুলিশকেই দায়ী করছেন রংপুর মহানগর সুজন সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু। তিনি বলেন, ‘হতে পারে এটি কাকতালীয়। আর যদি সিদ্ধার্থের বাবার কথা সত্য হয়, তবুও এই ঘটনা এতোটা আলোচনায় আনা ঠিক হয়নি। পুলিশ যদি একজনকে গেঞ্জি পরা অবস্থায় গ্রেফতারের পর নিজের শার্ট দেয়, সেটাও এক ধরনের মানবিকতা। পুলিশ সেটি খোলাসা করলে ইতিবাচক প্রচারণা পেতে পারতো। তবে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এতোটাই আলোচনায় আসলো, যেন এতো বড় খুনের ঘটনা শার্টকাণ্ডে আড়াল না হয়ে যায়।’