মাদারীপুরের শিবচরে উৎরাইল-শিবচর সড়কের আড়িয়াল খাঁ নদে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। এতে ঝুঁকিতে পড়েছে ৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতু। সেতুটির দক্ষিণ পাশে নতুন করে ভাঙছে নদের পাড়। ভাঙনে সেতুর পিলার ঝুঁকিতে পড়েছে। নদ শাসন বাঁধ না থাকায় বর্ষার শুরুতেই এমন ধ্বস নামায় আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় জনগণ।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুন থেকে জুলাই মাসের মধ্যে সেতু পাড়ের প্রায় ২০০ মিটার জায়গা ভেঙে পড়ে। চলতি বর্ষাতেও একই স্থানে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সেতুর একটি পিলার ছিল নদের পাড়ে। ভাঙনের ফলে ওই পিলারটি এখন নদের বেশ ভেতরে। অর্থাৎ, পিলার ছাড়িয়ে নদ অনেকদূর ভেতরে চলে এসেছে। সেতুর নিচের অংশসহ পাশে এরকম ভাঙনের ফলে সেতুটি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় জনগণ।
চলতি বর্ষাতেও ওই একই স্থানে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পাড়ের বালুমাটির পাড় প্রতিদিনই একটু একটু করে ভেঙে পড়ছে।
ওই এলাকা ঘুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর নিচে নদের পাড় ঘেঁষে ঘূর্ণিস্রোত। নদের পাড় ভেঙে নিচে পড়ছে। সেতুর নিচ থেকে দক্ষিণপ্রান্ত পর্যন্ত নদের পাড় বালু মাটির হওয়ায় স্রোতের ধাক্কায় সহজেই ভেঙে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা পল্লী ডাক্তার মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গত বছরই ভাঙন শুরু হয়েছে। সেতুর পাড়ে নদের প্রচণ্ড ঘূর্ণিস্রোত। এ ঘূর্ণিস্রোতের কারণেই ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। গত বার সেতুর কাছে ২০০ মিটারেরও বেশি জায়গা ভেঙেছে। সেতুর নিচে এবং পাশে এভাবে নদ ভাঙতে থাকলে সেতুটির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি। এবারো একটু একটু করে ভাঙছে।’
স্থানীয় সাংবাদিক ইমতিয়াজ আহমেদ ইমন বলেন, ‘গত বর্ষায় ভাঙনরোধে এলাকাবাসী মানববন্ধনও করেছিল। প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু তারা কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। সেতু নির্মাণের সময় দুই পাশে নদ শাসন বাঁধ দেয়ার কথা ছিল। সেতুটি চালু হওয়ার পরও নদের পাশে কংক্রিটের ব্লক বানাতে দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম নদের পাড়ে ব্লক ফেলবে। কিন্তু ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর ওই ব্লক উধাও হয়ে গেছে। নদে ব্লক না ফেললে ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে না।’
স্থানীয় বাসিন্দা মনির খান নয়া দিগন্তকে জানান, এই সেতুটি শিবচরের পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে দেয়। সেতুটি শুধু এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাওয়ার পথ নয়, এটি হয়ে উঠে আশা, অগ্রগতি আরো উন্নয়নের প্রতীক। কিন্তু এখন সেই প্রতীকই তীব্র স্রোতের কূলে দাঁড়িয়ে-ভয় আর উদ্বেগের নামান্তর।
শিবচর উপজেলা এলজিইডি অফিস থেকে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৪ নভেম্বর ৫৫০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৯.৮০ মিটার প্রস্থের ‘লিটন চৌধুরী’ নামে সেতুটি যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছিল। সেতুটি নির্মাণের ফলে শিবচর সদরের সাথে দত্তপাড়া, শিরুয়াইল, নিলখী ইউনিয়ন এবং রাজৈর থানা ও ভাঙা থানার সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে। ফলে এই অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর হয়।
উৎরাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: লিটন মুন্সী নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমার স্কুল সেতুর নিকটে হওয়ায় সহজে আমি বর্ষা মৌসুম উপলব্ধি করতে পারি। কারন, প্রতিদিন আমি এই সেতুর ওপর দিয়ে যাতায়াত করি। গতবার বর্ষার শুরুতেই সেতুর নিচে অনেকদূর ভেঙেছে। এবারো ভাঙন শুরু হয়েছে। পুরো বর্ষায় আরো ভাঙার আশঙ্কা রয়েছে। এখনই যদি ব্যবস্থা না নেয়া হয়, তবে সেতুটিও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।’
শিবচর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ৯৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে আড়িয়াল খাঁ নদের ওপর ৫৫০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৯.৮০ মিটার প্রস্থের সেতুটিতে স্প্যান সংখ্যা ১১টি এবং পিলার সংখ্যা নয়টি। সেতুটির পাইলের সংখ্যা ১২৩টি, পাইলের দৈর্ঘ্য ৪৮ মিটার। সেতুর জন্য অ্যাপ্রোচ সড়কের (সংযোগ সড়ক) দৈর্ঘ্য ১.৫০ কিলোমিটার। ৯৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটির নির্মাণ কাজ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মো: মইন উদ্দীন বাসি ও হা-মীম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচএম ইবনে মিজান বলেন, ‘বিষয়টি আমি জেনেছি। নদের ভাঙন সম্পর্কে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে।’
মাদারীপুর জেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী বাদল চন্দ্র কীর্তনীয়া বলেন, ‘দ্রুত সেতুর বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে নদের ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’



