পাহাড়ঘেরা মৌলভীবাজার জেলায় প্রতি বর্ষা মৌসুমেই টিলাধসের ঘটনা ঘটে। গত আট বছরে টিলাধসে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বর্ষার ভারী বৃষ্টিতেও জেলার বিভিন্ন স্থানে নতুন করে টিলাধসের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধভাবে অপরিকল্পিত টিলা কেটে মাটি বিক্রি করায় ঝুঁকি আরো বেড়েছে। প্রশাসন দুর্যোগের সময় মাইকিং করে সতর্ক করলেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর নিরাপদ পুনর্বাসনে দৃশ্যমান কোনো পরিকল্পনা নেই।
জানা গেছে, কমলগঞ্জ, রাজনগর, শ্রীমঙ্গল, জুড়ী, বড়লেখা, কুলাউড়া ও সদর উপজেলায় বিস্তীর্ণ টিলা ও পাহাড়ি এলাকা রয়েছে। এসব এলাকায় বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীসহ অন্তত ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া ও বড়লেখাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালীরা টিলা কেটে মাটি বিক্রি করছেন। এসব মাটি বসতবাড়ি, রিসোর্ট ও বাগান নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে বৃষ্টির সময় টিলাধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গলের রাধানগর, মোহাজেরাবাদ এবং কমলগঞ্জের রহিমপুর ইউনিয়নের কালেঙ্গা এলাকায় টিলা কেটে রাস্তা নির্মাণ, ছড়া দখল এবং বসতবাড়ি ও রিসোর্ট তৈরির অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যে, প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারির অভাবে টিলা কাটা বন্ধ হচ্ছে না। এতে পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষের জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালিঘাট ইউনিয়নের লাখাইছড়ার বাসিন্দা সবিতা তাঁতী, শশী তাঁতী, ফ্রান্সিস কন্দ ও জয়ন্তী তাঁতী বলেন, প্রতি বছর বর্ষায় পাহাড় ধসে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবারো বসতির পাশের পাহাড়ে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই সেখানে বসবাস করতে হচ্ছে।
রাজনগর উপজেলার করিমপুর ও ইটা চা বাগান এলাকায়ও টিলা কেটে মাটি বিক্রির দৃশ্য দেখা গেছে।
করিমপুর চা বাগানের বাসিন্দা মিনতি কৈরী বলেন, বাগান কর্তৃপক্ষ যেখানে বাসা দিয়েছে, সেখানেই থাকতে হচ্ছে। পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা নেই। ২০১৮ সালে পাশের টিলাধসে শিশুসহ দুইজনের মৃত্যু হয়েছিল।
একই বাগানের দীপক কর্মকার ও মুকেশ কর্মকার জানান, কয়েকদিন আগে টিলাধসে তাদের একটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অল্পের জন্য বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে।
ইটা চা বাগানের মনির মিয়া ও রশিদ মিয়া অভিযোগ করেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী টাকার লোভে টিলা কেটে মাটি বিক্রি করছেন। প্রতিবাদ করেও কোনো সুফল মিলছে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৮ সালে রাজনগরের করিমপুর চা বাগানে টিলাধসে শিশুসহ দুইজন মারা যান। ২০২২ সালের ১৯ আগস্ট শ্রীমঙ্গলের লাখাইছড়া চা বাগানে টিলাধসে চার নারী শ্রমিক নিহত হন। একই বছর কুলাউড়ার ভাটেরা এলাকায় তিন শিশু এবং চাতলাপুর চা বাগানে এক নারী মারা যান। ২০২৪ সালে কমলগঞ্জের আদমপুর বনবিটের কালেঞ্জি খাসিয়া পুঞ্জিতে টিলাধসে এক নারীর মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে টিলার মাটি আনতে গিয়ে মাটিচাপায় এক স্কুলছাত্রী নিহত এবং আরও তিনজন আহত হন।
পরিবেশ অধিদফতরের মৌলভীবাজারের সহকারী পরিচালক মাঈদুল ইসলাম বলেন, ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া টিলা কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। টিলা কাটার অভিযোগ পেলে আমরা অভিযান পরিচালনা করি।’
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, ‘টিলাধসে প্রাণহানিসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং প্রতিটি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’



