মেধাকে বাদ দিয়ে রাজনীতি বিবেচনা করলে অগ্রগতি সম্ভব নয় : রিজভী

‘শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের ফলাফল—সব ক্ষেত্রেই মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে হবে, যাদের মান ও যোগ্যতা দেখে মানুষ গর্ব করবে।’

মো: আজিজুল হক, গাজীপুর মহানগর

Location :

Gazipur
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন রুহুল কবির রিজভী
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন রুহুল কবির রিজভী |নয়া দিগন্ত

মেধাকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হলে কোনো প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের ফলাফল—সব ক্ষেত্রেই মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে হবে, যাদের মান ও যোগ্যতা দেখে মানুষ গর্ব করবে।’

রোববার (১৬ আগস্ট) গাজীপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসের সিনেট ভবনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘জুলাইয়ের চেতনা ও আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

রিজভী আহমেদ বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়ের চাহিদা ও কর্মসংস্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এত বড় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সঠিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা সহজ কাজ নয়।’

তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার ও আধুনিকায়ন কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থাকে বাজারের চাহিদার সাথে সম্পর্কিত না করলে তা শেষ পর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়বে।’

তিনি বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিধি কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়; পুরো বাংলাদেশই এর কার্যপরিধি। দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে। ফলে এখান থেকে সঠিক নীতিমালা, দিকনির্দেশনা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে বেকারত্ব কমানোর পাশাপাশি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নেও বড় ভূমিকা রাখা সম্ভব।’

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে রিজভী বলেন, ‘বিগত সময়ে বাজারের চাহিদার সাথে শিক্ষার সামঞ্জস্য ছিল না। ফলে উচ্চশিক্ষা শেষ করেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বেকার থেকেছেন। বর্তমান প্রশাসন কারিগরি ও ব্যবহারিক বিষয়, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং সময়োপযোগী বিভিন্ন কার্যক্রম যুক্ত করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই হবে না; একজন গ্র্যাজুয়েটকে এমন যোগ্যতা অর্জন করতে হবে, যাতে দেশ ও আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে তার মূল্য থাকে। শিক্ষার মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন করতে হবে।’

রিজভী বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগ বা ছাত্রদের ফলাফল—সবকিছুতেই মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এমনকি ৫ আগস্টের পরেও আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ না দিয়ে অন্য বিবেচনা করা হলে কোনো প্রতিষ্ঠান বা আলমা ম্যাটারের উন্নয়ন সম্ভব নয়। মেধাকে বাদ দিয়ে যদি রাজনীতি বিবেচনা করা হয়, তবে অগ্রগতি কখনোই সম্ভব নয়।’

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘সারা দেশের অসংখ্য কলেজ, গভর্নিং বডি ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি অল্প সময়ে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা সাধারণ কোনো বিষয় নয়।’

ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক মো: লুৎফর রহমানসহ সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগকে তিনি সাধুবাদ জানান।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে রিজভী আহমেদ বলেন, ‘জুলাই ছিল দীর্ঘদিনের সঞ্চিত ক্ষোভের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। আন্দোলনের নেতৃত্বে ছাত্ররা থাকলেও এতে শ্রমিক, রিকশাচালক, হোটেলের কর্মী, সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছেন এবং অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের চেতনা শুধু একটি আন্দোলনের স্মৃতি নয়; এটি বহুদলীয় ও বহুমাত্রিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটি অঙ্গীকার। এমন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে।’

রিজভী বলেন, ‘অতীতের দলীয়করণ, আত্মীয়করণ, ব্যাংক লুটপাট, রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য করা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের বিপরীতে সুশাসন, জবাবদিহী ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিটি কাজের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিন্নমত ও ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের জন্য পরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। কথা বলার কারণে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের চাকরি হারানো এবং নানা ধরনের হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমেছে এবং তারই বিস্ফোরণ ঘটেছে জুলাইয়ে।’

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, ‘৫ আগস্টের পর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেকটা শূন্য থেকে নতুন করে গড়ে তোলার কাজ শুরু করতে হয়েছে। প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী ও আড়াই হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে পরিচালিত এ বিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণে আনতে গত দুই বছরে ব্যাপক পরিশ্রম করতে হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘একসময় যত্রতত্র অনার্স-মাস্টার্স চালু হওয়ায় শিক্ষার মান ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছিল। অনেক কলেজে প্রয়োজনীয় ল্যাব ও অবকাঠামো না থাকলেও বিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স চালু ছিল। বর্তমানে এসব ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।’

ভিসি বলেন, “জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয়া এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ‘কোয়ালিটি এডুকেশন’, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’, ভাষা শিক্ষা, ইন-ক্যাম্পাস প্রোগ্রাম, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।”

তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৩১ জন নিহত হয়েছেন। তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শহীদ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, পরিবারের সদস্যদের চাকরিতে অগ্রাধিকার এবং শহীদ ও আহতদের পরিবারের শিক্ষার্থীদের সেশন ও টিউশন ফি মওকুফসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসে নিহতদের স্মরণে স্মৃতিসৌধও নির্মাণ করা হয়েছে।’

অধ্যাপক আমানুল্লাহ আরো বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে হলে গুণগত শিক্ষার বিকল্প নেই। আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক কর্মবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলাই এখন প্রধান লক্ষ্য।’

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক মো: লুৎফর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো: নাজমুল হোসাইন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কলেজ পরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত) নাজিম উদ্দীন আহমেদ ও আঞ্চলিক সমন্বয় দফতরের পরিচালক মো: আমিনুল আক্তার। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দফতরের বিভাগীয় প্রধান, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।