মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জমির উর্বরতা শক্তির ক্ষতির আশঙ্কা জেনেও অধিক মুনাফার আশায় তামাক চাষে ঝুঁকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। ধানসহ অন্যান্য ফসলের চেয়ে তামাকের বাজারমূল্য বেশি এবং তামাক কোম্পানিগুলোর আগাম সহায়তার কারণে কৃষকরা এই ক্ষতিকর বিষবৃক্ষ তামাক চাষ ছাড়তে পারছেন না। বর্তমানে সাটুরিয়ায় তামাকের পাতা তোলা এবং তা মাচায় ও দড়িতে গেঁথে শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার শিমুলিয়া, তিল্লি, আয়নাপুর, বরাইদ, আগ সাভার, উত্তর ছনকা, কৌড়ি, নাশুরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় তামাক পাতা তোলা ও গাঁথুনি কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিশু থেকে বৃদ্ধরা। শিশুরা মনের আনন্দে তামাক পাতা টাকার বিনিময়ে বাঁশের শলায় গেঁথে চলছে পাল্লা দিয়ে। সেই শলা কেউ মাচায়, কেউ প্লাস্টিকের দড়িতে ঝুলিয়ে রোদে শুকাতে দিয়েছে তামাকের জমিসহ আশপাশের বিভিন্ন জায়গায়। তামাকের জমি, সড়কের পাড়ে, এমনকি বাড়ির আঙিনায় এসব তামাক পাতা শুকাতে দেয়ায় ঝাঁঝাঁলো দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হন স্থানীয়সহ পথচারী। এতে দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টসহ নানা প্রকার রোগের শঙ্কা বেড়েই চলছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সাটুরিয়া উপজেলার তিল্লি, দিঘলীয় ও বরাইদসহ ইউনিয়নসহ অন্যান্য এলাকায় ১২০ হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হয়েছে। মাঠের পর মাঠ এখন তামাকের বড় বড় পাতায় সবুজ হয়ে আছে। যে তামাক পাতার রং হালকা হলুদ রং হয়েছে সেগুলো তুলে রোদে শুকানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তামাকের আগ্রাসন বন্ধ করতে হলে শুধু সচেতনতা নয়, বরং বিকল্প অর্থকরী ফসলের বাজারজাতকরণ এবং তামাক কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী বিপণন নীতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
গোপালপুর গ্রামের নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা জানি তামাক চাষে মাটির অনেক ক্ষতি হয়, কাজ করতে গেলে শ্বাসকষ্টও হয়। তারপরও এবার ১০০ শতাংশ জমিতে তামাক চাষ করেছি। ক্ষতি জেনেও তামাক চাষ না করে কি করব? ধান বা অন্য ফসল চাষ করলে অনেক সময় ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। সেসব ফসলে সার, কীটনাশকসহ অন্যান্য খরচ বেশি। অপর দিকে তামাক কোম্পানিগুলো আগেভাগেই আমাদের সার আর বীজ দিয়ে সাহায্য করে, আর ভালো দামে বিক্রির গ্যারান্টিও থাকে। তাই নিরুপায় হয়েই তামাক চাষ করছি।’
একই এলাকার তামাক চাষি মতিয়ার রহমান বলেন, ‘আর কিছু দিনের মধ্যে পুরোদমে তামাক ভাঙা হবে। এবার প্রায় তিন বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছি। আমরা তামাকের পাতা ছিঁড়ে মাচায় সাজাচ্ছি এবং দড়িতে গেঁথে শুকানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। রোদে ভালো ভাবে শুকানো হলে ভালো দাম পাব আশা করছি।’
বরাইদ এলাকার তামাক চাষি রাসেল মিয়া বলেন, ‘তামাক চাষে খাটুনি অনেক বেশি, কিন্তু নগদ টাকা পাওয়া যায়। অন্য ফসলের তুলনায় এতে লোকসান হওয়ার ভয় কম থাকে। তবে প্রতি বছর একই জমিতে তামাক চাষ করায় জমির জোর কমে যাচ্ছে, এখন আগের মতো সার দিলেও অন্য ফসল ভালো হতে চায় না।’
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা: তানিয়া তাবাসসুম বলেন, ‘সাটুরিয়ায় এবার ১২০ হেক্টর জমিতে তামাকের চাষ হয়েছে। আমরা কৃষকদের তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করার জন্য নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা ও উঠান বৈঠক করছি। তামাক কেবল মানবদেহের জন্যই ক্ষতিকর নয়, এটি মাটির উর্বরতা শক্তি এবং পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করে। আমরা কৃষকদের তামাকের বদলে উচ্চ ফলনশীল সরিষা, ধান, গম বা সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করছি। সরকারি প্রণোদনা ও সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের ক্ষতিকর তামাক চাষ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’



