ছাতক (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা
সুনামগঞ্জের ছাতক নদীবন্দরে ইজারার নির্ধারিত শর্তের বাইরে বাল্কহেড থেকে অতিরিক্ত শুল্ক আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের অভিযোগ, ছাতক নদীবন্দর এলাকায় চলাচলকারী প্রতিটি বাল্কহেড থেকে বিভিন্ন খাতে ১৩ থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। তবে এসব অর্থ কোন খাতে এবং কোন সরকারি নির্ধারিত ট্যারিফের ভিত্তিতে নেয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) দেয়া সাময়িক কার্যাদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নৌযান থেকে কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত শুল্কের হার অনুযায়ী শুল্ক আদায় করতে হবে এবং অধিক শুল্ক নেয়া যাবে না। একই সাথে ইজারার শর্ত ভঙ্গ হলে ইজারা সম্মতিপত্র বা কার্যাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে বাতিলের বিধানও রয়েছে।
২৫ দিনের সাময়িক কার্যাদেশ বিআইডব্লিউটিএ সিলেট আঞ্চলিক দফতরের নথি অনুযায়ী, মামলা-সংক্রান্ত কারণে ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরে ছাতক নদীবন্দর এলাকায় নৌযান/জাহাজের এলএসসি ও বার্দিং চার্জ আদায় কেন্দ্রের উন্মুক্ত টেন্ডার স্থগিত থাকায় ঘাট/পয়েন্টটি সাময়িকভাবে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
নথিতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনে দায়ের করা রিট পিটিশনের প্রেক্ষাপটে এবং কর্তৃপক্ষের বন্দর রাজস্ব আয় সমুন্নত রাখার স্বার্থে ইজারা প্রদান পদ্ধতি অনুযায়ী ঘাট/পয়েন্টটি সাময়িকভাবে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
নথি অনুযায়ী, ইজারাদার হিসেবে জুয়েল, বাবা মো: জয়নাল আবেদীনের নাম উল্লেখ রয়েছে।
সর্বশেষ ১৬ জুলাই ২০২৬ অনুষ্ঠিত স্পট কোটেশনে ৩০ দিনের জন্য প্রাপ্ত এক কোটি এক লাখ ২০ হাজার ৮০০ টাকা হারের ভিত্তিতে ২৫ দিনের জন্য ইজারামূল্য নির্ধারণ করা হয়। নথি অনুযায়ী, ইজারামূল্য বাবদ ৮৪ লাখ ৩৪ হাজার টাকা, ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ ১২ লাখ ৬৫ হাজার ১০০ টাকা এবং ১০ শতাংশ আয়কর বাবদ আট লাখ ৪৩ হাজার ৪০০ টাকা পৃথক পে-অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে।
সাময়িক কার্যাদেশে ইজারাদারের জন্য নির্ধারিত প্রতিপালনীয় শর্তাবলির প্রথমটিতেই বলা হয়েছে, নৌযান থেকে কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত শুল্কের হার অনুযায়ী শুল্ক আদায় করতে হবে এবং অধিক শুল্ক নেয়া যাবে না।
দ্বিতীয় শর্তে বলা হয়েছে, ইজারার শর্তাবলি ভঙ্গ করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে ইজারা সম্মতিপত্র বা কার্যাদেশ বাতিল করা হবে।
তৃতীয় শর্তে আরো বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের অন্য ঘাট/পয়েন্ট এলাকা থেকে আগত চলন্ত নৌযান থেকে কোনো অবস্থাতেই পুনরায় শুল্ক আদায় করা যাবে না। চতুর্থ শর্তে ঘাট/পয়েন্ট ইজারার ক্ষেত্রে প্রচলিত অন্য শর্তাবলি প্রযোজ্য হবে বলে উল্লেখ রয়েছে।
এ কারণে বাল্কহেডপ্রতি ১৩ থেকে ১৮ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ সামনে আসায় নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—এই অর্থের কত অংশ সরকারি অনুমোদিত ট্যারিফের আওতায় এবং কোন কোন খাতে তা নেয়া হচ্ছে।
সরকারি ট্যারিফে পণ্যভেদে নির্ধারিত হার!
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ১১ মে ২০১৬ সালের প্রজ্ঞাপনে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক আদায়যোগ্য ভাড়া, টোল, কর, ফি ও অন্য চার্জের ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ট্যারিফের কথা উল্লেখ রয়েছে। ট্যারিফের ৭.০১ ধারায় ইজারা দেয়া ঘাট বা পয়েন্ট দিয়ে মালামাল ওঠানামার ক্ষেত্রে প্রতি টন বা অংশবিশেষ ৭০ টাকা হারের কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে ৭.০২ ধারায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত জেটি বা অবকাঠামো তীরভূমি দিয়ে মালামাল ওঠানামার ক্ষেত্রে প্রতি টন ৫০ টাকা এবং যেসব দ্রব্যসামগ্রীর পরিমাপ ঘনফুট বা ঘনমিটারে নির্ধারিত হয়, সেসবের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনফুট ৫০ পয়সা হারের উল্লেখ রয়েছে।
ফলে কোন নৌযান থেকে কত টাকা আদায়যোগ্য হবে, তা নির্ভর করার কথা নৌযানে থাকা পণ্যের ধরন, পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট সেবার ওপর।
অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে বিআইডব্লিউটিএ সিলেট আঞ্চলিক দফতরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো: শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এ ব্যাপারে জানা নেই।’
তবে তিনি জানান, সরকারি ট্যারিফ অনুযায়ী বালুর ক্ষেত্রে প্রতি ঘনফুট ৫০ পয়সা এবং পাথরের ক্ষেত্রে প্রতি টন ৭০ টাকা হারে শুল্ক নেয়ার অনুমতি রয়েছে।
একই নৌযান থেকে একাধিক রশিদের তথ্যপ্রতিবেদকের হাতে থাকা কিছু রশিদে একই নৌযান ‘মেঘনা-৯’-এর জন্য একাধিক খাতে অর্থ আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে।
ছাতক পৌরসভার নামে থাকা একটি রশিদে ইজারাদার হিসেবে সেলিম আহমদের নাম রয়েছে। রশিদ নম্বর ১৯৬৯-এ আদায়ের পরিমাণ ১৮০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য একটি রশিদে ইজারাদার হিসেবে আবুল লেইছ মিয়ার নাম রয়েছে। রশিদ নম্বর ১৭৬৯। এতে লোড-আনলোডের ওপর টোল বাবদ এক হাজার ৫০০ টাকা আদায়ের তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ দু’টি রশিদে পৌরসভার নামে মোট এক হাজার ৬৮০ টাকা আদায়ের তথ্য পাওয়া যায়।
এ ছাড়া একই ‘মেঘনা-৯’ নৌযানের জন্য বিআইডব্লিউটিএর নামে পৃথক একটি রশিদও রয়েছে। ওই রশিদে মালের ধরন হিসেবে সিমেন্ট এবং শুল্ক বাবদ ১৩ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই নৌযানের ক্ষেত্রে এসব অর্থ কোন কোন সেবার বিপরীতে এবং একই এলাকায় একাধিক কর্তৃপক্ষ বা ইজারাদারের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের বৈধতা কী—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ছাতক পৌর প্রশাসক মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমি আসার আগে ছাতক পৌরসভা ইজারা দিয়েছে। তবে একই এলাকায় নৌপথে দু’টি ইজারা দেয়া হয়েছে কি না, আমার জানা নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।’
বিআইডব্লিউটিয়ের অতিরিক্ত টাকা নেয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারেও আমাদের জানা নেই। তবে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিআইডব্লিউটিএ সহযোগিতা চাইলে আমরা সহযোগিতা করব।’
ছাতক নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অরবিন্দ সরকার বলেন, ‘যারা ইজারা দিয়েছে, এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটএ আমাদের সহযোগিতা চাইলে আমরা সহযোগিতা করব। তারা ইজারা দিলে আমরা যাচাই-বাছাই করতে পারি না। তবে নৌযান মালিকরা অভিযোগ দিলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’
ছাতক-দোয়ারাবাজার সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার শেখ মো: মুরসালিন বলেন, ‘এ বিষয়ে তাদের কাছে কিছু অভিযোগ এসেছে। ’
বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিট পুলিশকে বলে দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের অভিযোগ, প্রতিটি বাল্কহেড থেকে ১৩ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে আদায় করা হচ্ছে। তাদের প্রশ্ন—প্রতিটি নৌযানে থাকা পণ্যের পরিমাণ ও সরকারি ট্যারিফ অনুযায়ী এই অর্থের হিসাব কিভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে?
তবে একটি বাল্কহেড থেকে আদায়কৃত পুরো অর্থই অতিরিক্ত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে নৌযানে থাকা পণ্যের পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট রশিদ এবং কোন কোন সরকারি ট্যারিফের আওতায় অর্থ নেয়া হয়েছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে বিআইডব্লিউটিএর সাময়িক কার্যাদেশে যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে ‘অধিক শুল্ক নেয়া যাবে না’ সেখানে অভিযোগ অনুযায়ী ১৩ থেকে ১৮ হাজার টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি নৌযানের পণ্যের পরিমাণ, প্রযোজ্য ট্যারিফ এবং আদায়ের রশিদ যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের দাবি, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত শুল্ক দিতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে প্রতিটি বাল্কহেড থেকে ১৩ থেকে ১৮ হাজার টাকা নেয়া হলে সেই অর্থের খাত, পণ্যের পরিমাণ, প্রযোজ্য ট্যারিফ এবং রশিদে তার হিসাব স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
তাদের দাবি, প্রতিটি নৌযানের পণ্যের পরিমাণের সাথে আদায়কৃত অর্থের হিসাব মিলিয়ে দেখা হোক। একই সাথে ছাতক নদীবন্দরে প্রতিদিন কতটি নৌযান থেকে কত টাকা আদায় হচ্ছে এবং সেই অর্থের কত অংশ সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে, তাও যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে ইজারাদার জুয়েলের বক্তব্যের জন্য তার ব্যক্তিগত মোবাইলে একাধিক কল করে তাকে পাওয়া যায়নি।
এখন সংশ্লিষ্টদের সামনে মূল প্রশ্ন—বাল্কহেডপ্রতি ১৩ থেকে ১৮ হাজার টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত সরকারি হিসাব কী, একই নৌপথে একাধিক খাতে শুল্ক আদায়ের বৈধতা কতটুকু এবং সাময়িক ইজারার শর্ত মেনে অর্থ আদায় করা হচ্ছে কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে হলে নৌযানভিত্তিক রশিদ, পণ্যের পরিমাণ, সরকারি ট্যারিফ, ইজারা চুক্তি এবং দৈনিক আদায়ের হিসাব একসাথে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা কিংবা অসত্যতা—দু’টিই একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হতে পারে।



