নানা সঙ্কটে ধুঁকছে ১৭০ বছরের পুরোনো চা শিল্প। অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, বিপরীতে কমেছে চায়ের দাম। আয়ের বিপরীতে ব্যয় প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়ায় চরম সঙ্কটে পড়েছে চা শিল্প।
এর মধ্যে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে ঘন ঘন আন্দোলন বেকায়দায় ফেলেছে মালিকপক্ষকে। এই অবস্থা চলতে থাকলে যেকোনো সময় বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন চা শিল্প সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, চা শিল্পের আর্থিক সংকট কাটাতে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার ‘টি সেক্টর অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে টাস্কফোর্স। এর আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ পুনর্গঠন, চা পুনরোপণের জন্য গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ এবং কারখানা আধুনিকায়নের জন্য সাত বছর মেয়াদি অর্থায়নের প্রস্তাব রয়েছে।

তথ্য বলছে, বহু বছরের লোকসান, উচ্চ সুদে ঋণ, রফতানি কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কম উৎপাদনশীলতার কারণে বাংলাদেশের চা শিল্প সঙ্কটে রয়েছে। ২০০২ সালের পর থেকে চা রফতানি ৭৯ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে গত এক দশকে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ৭৮ দশমিক ৩১ শতাংশ; কিন্তু নিলামমূল্য সেই হারে বাড়েনি।
বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে প্রতি বছরই উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম দামে চা বিক্রি হচ্ছে। ২০২৪ সালে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ২৬০ টাকা, বিপরীতে নিলামে গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ২০৮ দশমিক ৮৮ টাকা। ফলে প্রতি কেজিতে ৫১ দশমিক ১২ টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তথ্যমতে, বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী দেশ। দেশে ১৭২টি চা বাগানে ২০২৫ সালে ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। এ খাতে সরাসরি ১ লাখ ২ হাজার স্থায়ী ও ৪০ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক কাজ করেন। এ ছাড়া প্রায় ৫ লাখ মানুষ চা বাগানের ভেতরে বসবাস করেন।

তথ্যে প্রকাশ, চায়ের রাজধানী মৌলভীবাজার জেলা। এ জেলায় দেশের ৯২টি চা বাগান রয়েছে। এছাড়া সিলেটে ২২টি ও হবিগঞ্জে ২টি চা বাগান রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিটি চা বাগানেই সংকট বিরাজ করছে। মজুরি বৃদ্ধির নামে শ্রমিক উসকে দিচ্ছেন বাম সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এতে বিভিন্ন চা বাগানে শ্রমিক অসন্তোষ বিরাজ করছে, যার প্রভাব পড়ছে উৎপাদনে।
জানা গেছে, চলতি বছরের জুনের প্রথমার্ধে ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদের নেতৃত্বে গঠিত টাস্কফোর্স চা বাগানকে কৃষিখাত হিসেবে পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করার সুপারিশ করেছে। এতে বর্তমান ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের পরিবর্তে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। যদি এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়, তাহলে ঘুরে দাঁড়াতে পারে এ খাত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উৎপাদিত চায়ের রপ্তানি এখনো দুর্বল। চা রফতানি করে বছরে আয় হয় মাত্র ২৫ লাখ থেকে ৪৫ লাখ ডলার, আর পাকিস্তানই একমাত্র উল্লেখযোগ্য রফতানি বাজার। এ ছাড়া বাংলাদেশের কোনো জাতীয় চা ব্র্যান্ড, ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি কিংবা প্রিমিয়াম রফতানি বাজারে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি নেই। প্রতি হেক্টরে বাংলাদেশে চা উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কেজি; যেখানে ভারতে ২ হাজার ৫০০ কেজি এবং শ্রীলঙ্কায় ৩ হাজার ৩০০ কেজি। চা বাগানের মোট জমির প্রায় ৪৫ শতাংশে চা উৎপাদন হয় না। তবে এর মধ্যে মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশ জমি নতুন চা চাষের জন্য ব্যবহারযোগ্য। বাকি জমি পরিচালনাগত, আবাসিক ও পরিবেশগত কাজে ব্যবহৃত হয়।

চা শিল্পের আর্থিক সঙ্কট কাটাতে টাস্কফোর্স ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার ‘টি সেক্টর অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ পুনর্গঠন, চা পুনরোপণের জন্য গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ এবং কারখানা আধুনিকায়নের জন্য সাত বছর মেয়াদি অর্থায়নের প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ চা বোর্ড (বিটিবি) এবং বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) জন্য পৃথক বার্ষিক বাজেট বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে তিন স্তরের ন্যূনতম মূল্য কাঠামোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশীয় মানের চায়ের জন্য প্রতি কেজি ২৭৫ টাকা, রফতানিযোগ্য চায়ের জন্য প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২২০ টাকা এবং প্রতি কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধা। প্রিমিয়াম ও বিশেষায়িত চায়ের ক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি জাতীয় চা ‘পুনরোপণ মহাপরিকল্পনার’ প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় প্রতিটি বাগানকে ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে প্রতি বছর ২ থেকে ৩ শতাংশ চা-গাছ প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।
রফতানি পুনরুজ্জীবিত করতে পাকিস্তান, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়ার সাথে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি প্রণোদনা ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চা শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা, একটি ‘টি ইনভেস্টমেন্ট ডেস্ক’ গঠন এবং কৃষি প্রযুক্তি, সৌর অবকাঠামো ও প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
সৌর অ্যাগ্রিভোল্টাইক, ব্যাটারি জ্বালানি সংরক্ষণ, সেচ এবং কারখানা আধুনিকায়নের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে ‘বাংলাদেশ টি গ্রীন ফাইন্যান্স ফ্যাসিলিটি’ গঠনেরও সুপারিশ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র চা চাষিদের সহায়তায় উত্তরবঙ্গের ৮ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র চাষিকে কারিগরি সহায়তা ও মানোন্নয়ন সেবা দিতে পঞ্চগড়ে বাংলাদেশ চা বোর্ডের একটি স্থায়ী আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে শ্রমিক কল্যাণের ন্যূনতম মানদণ্ডও প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য সরকার পরিচালিত স্কুল, কার্যকর ডিসপেনসারি, অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা এবং বাগানের সড়ক উন্নয়ন। সংস্কার বাস্তবায়ন শুরু করতে টাস্কফোর্স ৯০ দিনের একটি পরিকল্পনাও দিয়েছে।
প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে তথ্য যাচাই এবং আর্থিক সহায়তার যোগ্যতা নির্ধারণে একটি আন্তমন্ত্রণালয় ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। ৬০ দিনের মধ্যে চা বাগানকে কৃষিখাত হিসেবে পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করা, ভ্যাট ও টি সেস সংস্কারের প্রস্তাব তৈরি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে ৬ শতাংশ সুদে বিশেষ ঋণ সুবিধা চালুর কথা বলা হয়েছে। ৯০ দিনের মধ্যে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করা, বিডায় টি ইনভেস্টমেন্ট ডেস্ক চালু করা, পাকিস্তানের সাথে বাণিজ্য আলোচনা শুরু করা এবং পঞ্চগড়ে বাংলাদেশ চা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয় চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
চা শিল্প টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক মামুন রশীদ মঙ্গলবার নয়া দিগন্তকে বলেন, চা কোম্পানিগুলোর আয় না বাড়লে শ্রমিকদের কল্যাণ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের পরিবারের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। মামুন রশীদ আরও বলেন, নতুন চারা রোপণ এবং সৌরবিদ্যুৎ সুবিধা গড়ে তোলার বিষয়টি আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। পাশাপাশি জি-টু-জি ব্যবস্থায় রফতানি এবং গ্রিন ফাইন্যান্সের সুযোগও দ্রুত সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।



