ময়মনসিংহ নগরীর কাঁচিঝুলির জয়নুল রোডের একটি পুরোনো ভবনের ভেতর ঢুকতেই কানে আসে তাঁতের খটখট শব্দ। ছোট ছোট কক্ষে বসে একদল নারী মনোযোগ দিয়ে বুনে চলেছেন কার্পেট, শতরঞ্জি আর নানা ধরনের কারুপণ্য। তাদের কারো কানে শোনার সমস্যা, কেউ কথা বলতে পারেন না, কেউবা হুইলচেয়ারে বসেই কাজ করেন। তবু থেমে নেই তাদের হাত চলছে জীবন গড়ার নিরলস চেষ্টা।
প্রতিবন্ধী আত্ম-উন্নয়ন সংস্থার তত্ত্বাবধানে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারীরা তৈরি করছেন দৃষ্টিনন্দন কারুপণ্য। ঝুট, পুরোনো কাপড়, রিসাইকেল সুতা ও নানা উপকরণ দিয়ে তৈরি এসব পণ্য এখন দেশ ছাড়িয়ে পৌঁছে যাচ্ছে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে।
এই কর্মযজ্ঞেরই একজন নীরব যোদ্ধা নপালী। নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরের বাসিন্দা এই নারী জন্মের পর থেকেই পোলিওতে আক্রান্ত। এখন তার বয়স (৩৫)। দুই চাকার হুইলচেয়ারে বসেই কাটে তার কর্মজীবনের প্রতিটি দিন।
নপালীর জীবনটা সহজ ছিল না। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর বড় বোন হিসেবে সংসারের ভার এসে পড়ে তার কাঁধে। কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দুই ছোট বোনকে পড়ালেখা করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন তিনি। নিজের জীবনের চেয়ে বোনদের ভবিষ্যৎই তখন ছিল তার বড় চিন্তা।
২০০৭ সালে প্রতিবন্ধী আত্ম-উন্নয়ন সংস্থার সাথে যুক্ত হন নপালী। শুরুতে কোনো লেখাপড়া জানতেন না। এখানে এসে ছয় মাস প্রশিক্ষণের পাশাপাশি লেখাপড়া শিখেছেন। এখন তিনি দক্ষ হাতে কার্পেট বুনতে পারেন, সেলাইও করেন।
হুইলচেয়ারে বসে কার্পেট বুনতে বুনতেই নপালী বলেন, ‘এখানে এসে কাজ শিখেছি। এখন নিজের আয় আছে। নিজের মতো করে বাঁচতে পারছি।’
শুধু নপালী নন, তার মতো আরো অনেক নারী এখানে কাজ করছেন। কেউ চোখে কম দেখেন, কানে শোনেন না, কেউবা জটিল রোগে আক্রান্ত। কিন্তু তাদের সবার মধ্যে রয়েছে নতুন করে বাঁচার এক অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
ঘরের চারপাশে সাজানো রয়েছে তাদের তৈরি রঙিন কার্পেট, মেয়েদের ব্যাগ, সিঁকেসহ নানা ধরনের কুটিরশিল্প পণ্য।
নান্দনিক নকশা আর মানসম্মত কাজের কারণে এসব পণ্য বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও সমাদৃত হচ্ছে। বর্তমানে ফ্রান্স, জাপান, বেলজিয়ামসহ ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে এসব কারুপণ্য।
আরেক কর্মী রিতা আক্তার বলেন, ‘এখানে আসার আগে জানতাম না এত প্রতিবন্ধী নারী কাজ করছেন। কাজ শিখে এখন নিজের প্রয়োজন নিজেই পূরণ করতে পারছি।’
প্রতিবন্ধীদের তৈরি পণ্য বিক্রির জন্য ‘প্রজাপতি ক্রাফট’ নামে একটি নিজস্ব শোরুমও রয়েছে। সেখানে পুতুল, মোমবাতি, কার্পেটসহ নানা ধরনের কারুপণ্য বিক্রি করা হয়।
প্রতিবন্ধী আত্ম-উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শেফালী আক্তার বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি সেবামূলক উদ্যোগ। এখানে যারা কাজ করেন সবাই প্রতিবন্ধী, এমনকি পরিচালনার সাথেও প্রতিবন্ধীরা যুক্ত আছেন। বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৫০ জন সদস্য রয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য প্রতিবন্ধী নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলা।’
তিনি আরো জানান, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও একটি স্থায়ী কারখানার জায়গা পেলে এই উদ্যোগ আরো বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে এবং অনেক প্রতিবন্ধী নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
ময়মনসিংহ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক রাজু আহমেদ বলেন, ‘প্রতিবন্ধী নারীদের নিয়ে নেয়া এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সমাজসেবা অধিদফতরের পক্ষ থেকে আমরা তাদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি।’
জীবনের প্রতিকূলতাকে জয় করে ময়মনসিংহের এই নারীরা প্রমাণ করছেন শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, ইচ্ছাশক্তিই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের হাতের বোনা কার্পেটের মতোই ধীরে ধীরে বোনা হচ্ছে আত্মনির্ভরতার নতুন এক গল্প।



