ধীরগতিতে এগিয়ে চলছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক (এন-২) চার লেন প্রকল্পের কাজ। চলতি বছরের ডিসেম্বরে পঞ্চম বারের মতো বাড়ানো প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। মেয়াদ ফুরিয়ে এলেও চার বছরে কাজের গড় অগ্রগতি মাত্র ২৫ শতাংশ।
এদিকে মহাসড়কটির সংশোধিত প্রকল্পের মেয়াদ আবারো ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ। প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। আগামী একনেকে প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাব উঠতে পারে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, মহাসড়কের চার লেন উন্নয়ন প্রকল্প চলায় দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার করা হচ্ছে না দুই লেনের এই মহাসড়ক। ফলে মহাসড়কজুড়ে তৈরি হয়েছে বড় গর্ত। আর এতে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট ও ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা।
সম্প্রতি সড়ক ও জনপদ অধিদফতরের (সওজ) প্রতিবেদনে দেশের তৃতীয় দুর্ঘটনাপ্রবণ মহাসড়ক হিসেবে এই মহাসড়ককে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই মহাসড়কে ৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
তথ্য বলছে, নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত ২০৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করার কাজ এগিয়ে চলছে। ২০২২ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্প ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সমাপ্ত হওয়ার কথা থাকলেও ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হচ্ছে না। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যমান জটিলতা কাটিয়ে আগামী আড়াই বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সিলেট-ঢাকা জাতীয় মহাসড়ক আন্তর্জাতিক মানের সড়কে রূপ নেবে। উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগের দিক থেকেও প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জানা গেছে, ২০২২ সালে ১২টি প্যাকেজে শুরু হয় ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার কাজ। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জজুড়ে ২০৯ কিলোমিটার মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার কাজ এখন দ্রুত এগোচ্ছে। এই প্রকল্পে মূল চার লেনের পাশাপাশি ধীরগতির যানবাহনের জন্য দু’টি সার্ভিস লেনও থাকবে।
তথ্য মতে, প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ঋণ দিচ্ছে ১৩ হাজার ২৪৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হচ্ছে ৬৬টি সেতু, ৩০৫টি কালভার্ট, সাতটি ফ্লাইওভার ও ওভারপাস এবং ছয়টি রেলওয়ে ওভারপাস। এর মধ্যে ৬৬টি সেতুর ৬০টির কাজ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পেয়েছে। এছাড়া ২০০টির বেশি কালভার্টের নির্মাণকাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
সওজ বলছে, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান ও চীনের সাথে যোগাযোগে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগাতেই এ প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। মহাসড়কের বিভিন্ন বাঁক সরলীকরণ করা হবে এবং অধিক যান চলাচলের উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে।
জমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত জটিলতাও ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন সিলেট সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খাইরুল বাশার মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হলে মহাসড়কের নির্মাণকাজ দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এই মহাসড়কের কাজের সার্বিক অগ্রগতি ২৫ শতাংশ।’
জানা গেছে, মহাসড়কের নির্মাণ কাজ চলমান থাকায় বর্তমানে ঢাকা থেকে সিলেট যেতে সড়কপথে সময় লাগছে ১০-১৬ ঘণ্টা। এতে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সিলেটবাসী। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পর্যটন খাত।
সিলেট হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও রেস্ট হাউস ওনার্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ বলেন, ‘পাঁচ তারকা হোটেলসহ বিভিন্ন মানের আবাসন খাতে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ যানজট ও সড়কের ধীরগতির কারণে এসব বিনিয়োগ প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছে না।’
অন্যদিকে শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আশা প্রকাশ করে নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ এখন দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। আগামী আড়াই বছরের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।’
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘সরকার এই মহাসড়ক সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করছে। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত তা সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’



