দেবীগঞ্জে ইটভাটার থাবা, ফসলি জমির টপ সয়েল লুট

ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে ফেললে জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়। টপ সয়েল হলো মাটির সবচেয়ে উর্বর স্তর, যা জৈব ও খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ। সাধারণত মাটির ওপরের আট থেকে ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত এই স্তর থাকে।

শেখ ফরিদ, দেবীগঞ্জ (পঞ্চগড়)

Location :

Panchagarh
কেটে নেয়া হচ্ছে ফসলি জমির টপ সয়েল
কেটে নেয়া হচ্ছে ফসলি জমির টপ সয়েল

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দণ্ডপাল ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কালীডাঙ্গা এলাকায় দিন-রাত ভেকু (এক্সকাভেটর) ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে ফসলি জমির মাটি কাটা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে ভবিষ্যৎ চাষাবাদ চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

সরেজমিনে দণ্ডপাল ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, হাওরের ফসলি জমি থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৪ ফুট গভীর করে টপ সয়েল কেটে নেয়া হচ্ছে। এসব মাটি দেবীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ও ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। মাটি পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে অনুমোদনবিহীন মাহিন্দ্রা ট্রলি ও ড্রাম ট্রাক, যার ফলে গ্রামীণ সড়কগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ট্রলি ও ট্রাকে বহন করা মাটি সড়কের ওপর পড়ে থাকায় পথচারী ও যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে সারাদিন রাস্তাঘাট ধুলোর কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আবার বৃষ্টির সময় জমে থাকা কাদামাটির কারণে সড়ক পিচ্ছিল হয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, মাটি ব্যবসায়ীরা নগদ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে অল্প দামে জমির মালিকদের কাছ থেকে ফসলি জমির মাটি কিনে নিচ্ছে। প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাবে অবাধে চলছে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড। এতে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, ফসল উৎপাদন কমছে এবং ধীরে ধীরে দেবীগঞ্জ উপজেলার ভৌগোলিক কাঠামোও পরিবর্তিত হচ্ছে।

গণমাধ্যমকর্মীরা সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পান, ফসলি জমি কেটে পুকুর খনন দেখানো হলেও মূল উদ্দেশ্য মাটি বিক্রি করা। জমির মালিক দিনরঞ্জন রায় বলেন, ‘নিজেদের প্রয়োজনেই জমি থেকে মাটি কাটছি। কৃষিজমি কেটে পুকুর খনন করছি।’

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ইটভাটাগুলো ফসলি জমির টপ সয়েল তুলে নিচ্ছে। এতে জমির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। দ্রুত অভিযান চালিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাঈম মোর্শেদ বলেন, ‘ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে ফেললে জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়। টপ সয়েল হলো মাটির সবচেয়ে উর্বর স্তর, যা জৈব ও খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ। সাধারণত মাটির ওপরের আট থেকে ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত এই স্তর থাকে। টপ সয়েল নষ্ট হলে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অন্তত তিন বছর সময় লাগে।’

তিনি আরো জানান, কৃষকদের টপ সয়েল না কাটতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘ভেকু দিয়ে ফসলি জমি থেকে মাটি কাটার বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। অবৈধ প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী সায়েমুজ্জামান বলেন, ‘কৃষিজমির মাটি কাটার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

Topics