ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত ছেলের লা‌শের অপেক্ষায় মা

গৌরীপুরের ইয়াসিনের লাশ রাশিয়ায়, এক বছরেও দেশে ফেরেনি

ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার যুবক ইয়াসিন মিয়া শেখের মৃত্যুর এক বছর পেরিয়ে গেলেও তার লাশ এখনো দেশে ফেরেনি। প্রিয় সন্তানের লাশের অপেক্ষায় দিন গুনছেন তার মা ফিরোজা বেগম।

ময়মনসিংহ অফিস

Location :

Mymensingh

ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার যুবক ইয়াসিন মিয়া শেখের মৃত্যুর এক বছর পেরিয়ে গেলেও তার লাশ এখনো দেশে ফেরেনি। প্রিয় সন্তানের লাশের অপেক্ষায় দিন গুনছেন তার মা ফিরোজা বেগম।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২৭ মার্চ ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত হন ইয়াসিন। তবে তার মৃত্যুর খবর পরিবার পায় ১ এপ্রিল। এরপর থেকে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতরের যোগাযোগ ও আবেদন করেও লাশ কিংবা কোনো ক্ষতিপূরণ এখনো পায়নি পরিবার।

নিহতের বড় ভাই মো: রুহুল আমিন শেখ বলেন, রাশিয়ার একটি সামরিক হাসপাতালে ইয়াসিনের লাশ সংরক্ষিত রয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। দ্রুত লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু একাধিক পত্রালাপের পরও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।

ইয়াসিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে মুহ্যমান মা ফিরোজা বেগম ছেলের ছবিতে হাত বুলিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। বাড়ির পাশ দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শুনলেই তিনি ছুটে গিয়ে বলেন—‘এই তো আমার ইয়াসিন আসছে।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে এনে দাও। আমার সোনা মানিকের লাশটা একবার ছুঁয়ে দেখি।’ তিনি জানান, মৃত্যুর আগের দিন ২৬ মার্চ ছেলের সাথে শেষবার কথা হয়েছিল। ‘টাকা পাঠাবে, ঘর বানাবে—অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছিল। সেটাই ছিল শেষ কথা।’

বাংলাদেশ দূতাবাস, মস্কোর শ্রম কল্যাণ উইংয়ের প্রথম সচিব (শ্রম) মো: মাজেদুর রহমান সরকার এক পত্রে জানিয়েছেন, ইয়াসিনের লাশ শনাক্তকরণ ও দ্রুত দেশে পাঠাতে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

জানা গেছে, ইয়াসিন মিয়া শেখ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন। ‘বাংলা ব্লকেড’সহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে সরব উপস্থিতি ছিল তার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আন্দোলনসংক্রান্ত পোস্ট ও বার্তায় সক্রিয় ছিলেন তিনি।

পরবর্তীতে জীবিকার তাগিদে এবং বাবার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে রাশিয়ায় যান ইয়াসিন। প্রথমে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিলেও পরে অনলাইনে আবেদন করে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। সেখান থেকেই তাকে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হয়।

ইয়াসিন গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের মরিচালী গ্রামের মৃত আব্দুস সাত্তার মীরের ছেলে। তিনি ২০১৯ সালে ডৌহাখলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০২১ সালে গৌরীপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকার বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজে বিবিএতে অধ্যয়নরত ছিলেন।

পরিবারের স্বপ্ন ছিল, ছেলে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে বাবার ইচ্ছা পূরণ করবে। সে স্বপ্ন পূরণ হলেও তা এখন এক গভীর বেদনার গল্প—যেখানে এখনো বাড়ির উঠানে ফিরে আসেনি সন্তানের নিথর দেহ।