আমির উদ্দিন, গোয়াইনঘাট (সিলেট)
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নেই, কার্যালয় নেই, পরিষদের সদস্য নেই—এমন এক বিরল ইউনিয়নের খোঁজ মিলল সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায়।
উপজেলার ১০ নম্বর পশ্চিম আলীরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের গোয়াইনঘাট উপজেলা সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া হেলাল বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পরই তিনি আমেরিকা গমনকালে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আলিম উদ্দিন আলিমকে প্যানেল চেয়ারম্যান থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়ে যান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে হেলাল চেয়ারম্যানের দেশে আসা অনিশ্চিত হয়ে পড়লে দায়িত্ব পালন করছিলেন ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আলিম উদ্দিন।
গত ১১ আগস্ট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আলিম উদ্দিনের আকস্মিক মৃত্যু হয়। এর পর থেকেই মূলত অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে এই ইউনিয়ন পরিষদটি। নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্যানেল চেয়ারম্যানের মাধ্যমে দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা থাকলেও ইউপি সদস্যদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও জটিলতার কারণে এখনো নতুন কাউকে দায়িত্ব দেয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়াও শূন্য হয়ে পড়ে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য পদটি।
বর্তমানে এটি সম্পূর্ণ চেয়ারম্যানশূন্য অবস্থায় রয়েছে। এতে স্থবির হয়ে পড়েছে পরিষদের সকল কার্যক্রম। জন্মনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদসহ জরুরি নানা প্রাতিষ্ঠানিক সেবা না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ইউনিয়নের ১৭ হাজারেরও বেশি বাসিন্দা।
এছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব কোনো কার্যালয় নেই। ইউনিয়নের হাতিরপাড়া এলাকার একটি বাড়িতে কোনোমতে চলছে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২২ সালের নির্বাচনে এই ইউনিয়নে গোলাম কিবরিয়া হেলাল চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে পরিষদের সকল সদস্যের সর্বসম্মতিক্রমে আলিম উদ্দিনকে ১ম প্যানেল চেয়ারম্যান, ফারুক আহমদ বাবুলকে ২য় প্যানেল চেয়ারম্যান এবং প্রবাসী রাণীকে ৩য় প্যানেল চেয়ারম্যান মনোনীত করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর মূল চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া হেলাল অনুপস্থিত থাকায় ১ম প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে আলিম উদ্দিন দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে হেলাল চেয়ারম্যানকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আলিম উদ্দিনই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সর্বমোট ১৭ হাজার ৬১৮ জন ভোটারের এই ইউনিয়নে বর্তমানে নাগরিক সেবা পুরোপুরি বন্ধ থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘চেয়ারম্যান না থাকায় আমাদের জরুরি কাগজপত্র বা সার্টিফিকেটের কাজ করানো যাচ্ছে না। প্রতিদিন ইউনিয়ন পরিষদে এসে সাধারণ মানুষকে ঘুরে যেতে হচ্ছে। আমরা দ্রুত এই সঙ্কটের সমাধান চাই।’
ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান জানান, চেয়ারম্যান বা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর ও অনুমোদন ছাড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ দাফতরিক কাজ এবং সরকারি অনুদান বণ্টন আটকে আছে। দ্রুত কোনো সমাধান না হলে নাগরিক ভোগান্তি আরো তীব্র আকার ধারণ করবে।
বর্তমানে ২য় প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ বাবুল দায়িত্ব পাওয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘যেহেতু এতদিন ১ম প্যানেল চেয়ারম্যান আলিম উদ্দিন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তার মৃত্যু হয়েছে, সেহেতু নিয়ম অনুযায়ী ২য় প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে আমার কাছেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার কথা। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এখনো আমাকে দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে না। জনগণের ভোগান্তি দূর করতে আমি দ্রুত দায়িত্ব হস্তান্তরের জোর দাবি জানাচ্ছি।’
অন্যদিকে বর্তমান প্যানেল বাতিলের দাবি জানিয়েছেন ইউপি সদস্য মাসুক আহমদ। তিনি বলেন, ‘বিগত আওয়ামী সরকার ও তৎকালীন চেয়ারম্যানের মাধ্যমে গঠিত এই প্যানেল আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। অবিলম্বে এটি বাতিল করে নতুন প্যানেল গঠন এবং যোগ্য ব্যক্তির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের মাধ্যমে জনগণের ভোগান্তি দূর করতে হবে।’
বর্তমান প্যানেল বাতিলের দাবিতে তারসহ পরিষদের সাতজন সদস্যের স্বাক্ষরিত একটি স্মারকলিপি ইতিমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বরাবর জমা দেয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, ‘পশ্চিম আলীরগাঁও ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মৃত্যুর পর তৈরি হওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা পুরোপুরি অবগত আছি। স্থানীয় সরকার আইন এবং সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সেখানে দায়িত্ব হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেয়া হবে। জনগণের যাতে কোনো ধরনের ভোগান্তি না হয় এবং নাগরিক সেবা যেন ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ। আমরা আশা করছি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সমস্যা দূর হবে।’
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মৃত্যু এবং ইউপি সদস্যদের প্যানেল পুনর্গঠনের এই রেষারেষিতে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সাধারণ জনগণ। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, সাধারণ মানুষের স্বার্থে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত আইনানুগ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।



