কেটে ফেলা হলো শাহজালাল রহ:-এর মাজারের শতবর্ষী খেজুরগাছ, তীব্র ক্ষোভ

পরিবেশবিদদের মতে, মাজারের মতো ঐতিহাসিক জায়গায় যেকোনো উন্নয়নকাজে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা উচিত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা স্পষ্টভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
কেটে ফেলা হলো শাহজালাল রহ:-এর মাজারের শতবর্ষী খেজুরগাছ
কেটে ফেলা হলো শাহজালাল রহ:-এর মাজারের শতবর্ষী খেজুরগাছ |ছবি : নয়া দিগন্ত

সিলেটে হযরত শাহজালাল রহ:–এর মাজার মসজিদ প্রাঙ্গণের মিনারের পাশে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা খেজুরগাছগুলো আর নেই। সিলেটের পরিচয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির দীর্ঘ কয়েক শ’ বছরের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এই গাছগুলো।

হঠাৎ করে মাত্র দু’তিন দিনে উন্নয়নের নামে অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তে কেটে ফেলা হলো বহু শত বছরের স্মৃতিবাহী এসব গাছ। এই দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষ ও পরিবেশবাদীরা শুধু নন, হতবাক ও ব্যথিত মাজারের ভক্তরাও। নগরজুড়ে ক্ষোভের ঝড় বয়ে চলছে এই ঘটনায়। নগরীতে এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন সাধারণ নগরবাসীও।

অনেকেই বলছেন, শুধু গাছ নয়, এগুলো ছিল মাজার প্রাঙ্গণের আত্মিক সৌন্দর্যের অংশ। ‘এদের ছায়ায় বসে কত মানুষ দোয়া করেছে, কতো স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আজ হঠাৎ কেটে ফেলা হলো—মন ভেঙে যায়।’ বলেন মাজারের এক ভক্ত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাজার মসজিদের উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে অস্থায়ী নামাজের স্থান তৈরির কথা বলে খেজুরসহ বেশ কয়েকটি পুরনো গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।

মসজিদ কর্তৃপক্ষের দাবি, পুরোনো তিন তলা ভবন ভেঙে ছয়তলা মসজিদ নির্মাণের সময় অস্থায়ী টিনশেড মসজিদ নির্মাণ ছাড়া উপায় ছিল না।

কিন্তু দরগাহ এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, আগেও গাছ রেখে সামিয়ানা দিয়ে অস্থায়ী ব্যবস্থা করা হয়েছে। এবার কেন হঠাৎ করে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত? তাদের মতে, গাছ কাটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক।

শাহজালাল মাজার মসজিদ পরিচালনা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম এম সোহেল উদ্দিন আহমেদ জানান, বিষয়টি নিয়ে কমিটির ভেতর একাধিক বৈঠক হয়েছে। তাদের অবস্থান ছিল- গাছ যেন না কাটা হয়। কিন্তু কোনোভাবেই এগুলো রক্ষা করা গেল না।

তিনি বলেন, অস্থায়ী নির্মাণের জন্য কেন এই গাছগুলো কাটতেই হবে- এ নিয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা আমরা পাইনি।’

এ ব্যাপারে শাহজালাল মাজার মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুফতি মোহাম্মদ হাসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো বক্তব্য দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।

তবে নিজের অপারগতার কথা জানালেও মাজারের একজন খাদেম নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করেছি গাছ বাঁচাতে। কিন্তু যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা আমাদের অনুরোধ শুনলেন না। এটা আমাদের জন্যও কষ্টের।’

গাছ কাটার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সিলেটে ক্ষোভ আরো তীব্র হয়। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো একে ‘বিবেকহীন সিদ্ধান্ত’ উল্লেখ করে অভিযোগ তুলেছে। পাশাপাশি দাবি করেছে- ঐতিহাসিক স্থানের প্রকৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষই পালন করেনি।

প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের সিলেটের সমন্বয়ক সাংবাদিক সাদিকুর রহমান সাকী বলেন, এই গাছগুলো শুধু সবুজ সৌন্দর্য ছিল না, এগুলো ছিল মাজারের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। উন্নয়ন অবশ্যই দরকার, কিন্তু উন্নয়ন মানে ঐতিহ্যকে হত্যা করা নয়। টিনশেড ঘর নির্মাণের জন্য এমন পুরনো খেজুরগাছ কাটা কখনোই যুক্তিসংগত হতে পারে না।

তিনি আরো বলেন, এগুলো বড় হতে লেগেছে বছরের পর বছর। কিন্তু কাটতে লেগেছে মাত্র কয়েক মিনিট। এই ক্ষতি ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ। ধর্মীয় স্থানের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করা দায়িত্বশীলদের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত।

পরিবেশবিদদের মতে, মাজারের মতো ঐতিহাসিক জায়গায় যেকোনো উন্নয়নকাজে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা উচিত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা স্পষ্টভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।

মাজারে আগত ভক্তরাও বিষয়টি মানতে পারছেন না।

এক বৃদ্ধ ভক্ত বলেন, শাহজালাল মাজারে ঢুকলেই খেজুরগাছগুলোর নিচে দাঁড়িয়ে মনে হতো—এই শহরের সব ইতিহাস যেন এখানে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আজ সেগুলো নেই দেখে মনে হলো নিজের অতীতটাই যেন হারিয়ে ফেললাম।

আরেকজন শিক্ষার্থী বলেন, সিলেটের প্রতিটি মানুষেরই এই দৃশ্যের সাথে আবেগ জড়িত। এভাবে কাটার আগে জনগণের মতামত নেয়ার দরকার ছিল। উন্নয়ন মানে কি ঐতিহ্য মুছে ফেলা?

নাগরিক সমাজ মনে করে, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তারা আশঙ্কা করে বলেন, এভাবে একের পর এক ঐতিহ্যবাহী স্থানে গাছ কাটা বা পরিবর্তনের নামে ধ্বংসযজ্ঞ চলতে থাকলে শহরের ঐতিহাসিক পরিচয়টাই একসময় মুছে যাবে।