আম ও কোরবানির পশু পরিবহনে বহুল আলোচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-ঢাকা রুটের ম্যাঙ্গো ও ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন এবার আর চালু হচ্ছে না। ধারাবাহিক লোকসান, প্রত্যাশিত পরিমাণ পণ্য পরিবহন না হওয়া এবং ব্যবসায়ী-খামারিদের কম আগ্রহের কারণে এ দুই বিশেষ ট্রেন সেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, আমের মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী অঞ্চলের আম দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে রাজধানীতে পৌঁছে দিতে ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো ম্যাঙ্গো স্পেশাল ট্রেন চালু করা হয়। একই বছর পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশু পরিবহনের জন্য চালু করা হয় ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন। ট্রেন দু’টি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ছেড়ে রাজশাহী, সরদহ, আড়ানী, আব্দুলপুর ও ঈশ্বরদী হয়ে ঢাকায় যাতায়াত করত।
রেলওয়ের পরিকল্পনা ছিল প্রান্তিক আমচাষি, বাগানমালিক ও খামারিদের জন্য সাশ্রয়ী পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করা। শুরুতে এ উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হলেও পরবর্তী সময়ে তা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। পর্যাপ্ত পণ্য ও পশু পরিবহন না হওয়ায় ট্রেনগুলো অনেক সময় প্রায় ফাঁকা অবস্থায় চলাচল করেছে। ফলে আয়-ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ম্যাঙ্গো স্পেশাল ট্রেন থেকে রেলের আয় হয়েছিল ১৩ লাখ ৩৭ হাজার ৫৩৬ টাকা, বিপরীতে ব্যয় হয় ৫৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। পরের বছর ২০২১ সালে আয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ লাখ ৩০ হাজার ৯২৮ টাকায়, তবে ব্যয় হয় ৫৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এরপর ২০২২ ও ২০২৩ সালে আয় আরো কমে যায়। ২০২৪ সালে শুধু ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন চালু রাখা হলেও সেখানেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি।
রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ম্যাঙ্গো ও ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন থেকে মোট আয় হয়েছে প্রায় অর্ধকোটি টাকা। অন্যদিকে জ্বালানি, জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় মিলিয়ে ব্যয় দাঁড়িয়েছে দুই কোটি টাকারও বেশি। এতে সব মিলিয়ে লোকসানের পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
চাষি ও খামারিদের একটি অংশ বলছেন, ট্রেনের ভাড়া তুলনামূলক কম হলেও বাস্তব পরিবহন ব্যবস্থায় নানা জটিলতা ছিল। বাগান বা খামার থেকে স্টেশনে পণ্য পৌঁছানো এবং ঢাকায় পৌঁছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে নেয়ার জন্য আলাদা পরিবহন খরচ বহন করতে হতো। সময়ক্ষেপণ ও অতিরিক্ত ঝামেলার কারণে অনেক ব্যবসায়ী শেষ পর্যন্ত সড়কপথকেই বেশি সুবিধাজনক মনে করেছেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার আলী বলেন, ‘উদ্যোগটি ভালো ছিল। কিন্তু পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল। ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই এটি চালু করা হয়েছিল। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি।’
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘চাষি, বাগানমালিক ও খামারিদের প্রত্যাশিত আগ্রহ পাওয়া যায়নি। অর্থনৈতিকভাবে ট্রেন দু’টি টেকসই না হওয়ায় আপাতত ম্যাঙ্গো ও ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে বিষয়টি আবার বিবেচনা করা হতে পারে।’
বিশেষ ট্রেনসেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন আমচাষি ও খামারিদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও পরিকল্পনার দুর্বলতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ব্যবসায়ী, কৃষক ও রেল কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ সফল করা কঠিন হবে।



