পথে-প্রান্তরে আগুনরাঙা কৃষ্ণচূড়া, কমে যাচ্ছে নান্দনিক ঐতিহ্য

তপ্ত বৈশাখের দুপুরে যখন সূর্য আগুন ঢেলে দেয় মাটির বুকে, তখন ঠিক এমনই এক লাল বিস্ফোরণ ছড়িয়ে পড়ে পথের ধারে, গাছের ডালে ডালে। সবুজের ভেতর থেকে জ্বলে ওঠে কৃষ্ণচূড়ার রক্তরাঙা আগুন।

আব্দুর রাজ্জাক, ঘিওর (মানিকগঞ্জ)

Location :

Manikganj
আগুনরাঙা কৃষ্ণচূড়া
আগুনরাঙা কৃষ্ণচূড়া |নয়া দিগন্ত

‘কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জুরি কর্ণে-আমি ভুবন ভুলাতে আসি গন্ধে ও বর্ণে’ কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই মনোমুগ্ধকর গান আমাদের স্মরণ করে দেয় কৃষ্ণচূড়ার তাৎপর্য।

দগ্ধ দিনের বুকে যেন আগুনেরই নরম সুর-গান-কবিতার এই পঙক্তি যেন শুধু সাহিত্য নয়, বরং মানিকগঞ্জের গ্রীষ্মের বাস্তব চিত্র। তপ্ত বৈশাখের দুপুরে যখন সূর্য আগুন ঢেলে দেয় মাটির বুকে, তখন ঠিক এমনই এক লাল বিস্ফোরণ ছড়িয়ে পড়ে পথের ধারে, গাছের ডালে ডালে। সবুজের ভেতর থেকে জ্বলে ওঠে কৃষ্ণচূড়ার রক্তরাঙা আগুন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই আগুন পোড়ায় না, বরং শান্ত করে চোখ, প্রশান্তি দেয় মনকে।

মানিকগঞ্জের ঘিওর, দৌলতপুর, শিবালয়, সিঙ্গাইর, হরিরামপুর, সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ সদরের পথে-প্রান্তরে এখন কৃষ্ণচূড়ার এই রঙিন উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। কোথাও সড়কের দুই পাশে সারি সারি গাছ, কোথাও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনা, আবার কোথাও গ্রামের মেঠোপথ—সবখানেই লাল পাপড়ির ছড়াছড়ি। মনে হয়, সবুজ পৃথিবীর বুক চিরে যেন লাল রঙের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে।

ঘিওর সরকারি কলেজ সংলগ্ন ঘিওর–দৌলতপুর সড়ক যেন এই সৌন্দর্যের সবচেয়ে জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো ফুলে ভরে উঠেছে। ঝরে পড়া পাপড়িতে রাস্তার ওপর তৈরি হয়েছে লাল কার্পেট। সেই কার্পেটের ওপর দাঁড়িয়ে থমকে যাচ্ছেন পথচারীরা—কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, কেউ আবার শুধু চুপচাপ দেখে যাচ্ছেন প্রকৃতির এই নীরব শিল্প।

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কবি দোলা রায় বলেন, ‘একসময় কৃষ্ণচূড়া ছিল পথের স্বাভাবিক সৌন্দর্য, এখন তা স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে।’ তিনি মনে করিয়ে দেন, এই গাছ শুধু সৌন্দর্য নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ।

ঢাকা–আরিচা মহাসড়কের জাগীর এলাকায়ও একই দৃশ্য। ব্যস্ত সড়কের পাশে হঠাৎ কৃষ্ণচূড়ার লাল ছোঁয়া যেন চলমান জীবনের গতি এক মুহূর্তে থামিয়ে দেয়। এক পরিবার গাড়ি থামিয়ে নেমে আসে। শিশুরা দৌড়ে যায় গাছের নিচে। ক্যামেরায় বন্দি হয় সেই মুহূর্ত। পরিবারের কর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া যাচ্ছিলাম। হঠাৎ এই লাল ফুলের সারি দেখে গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়েছি। বাচ্চাদের বললাম, এটা শুধু গাছ না, এটা প্রকৃতির অনবদ্য ছবি। এমন দৃশ্য না থেমে দেখা যায় না।’

তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালেই রয়েছে এক নিঃশব্দ সংকট। প্রবীণদের মতে, একসময় গ্রামবাংলার পথে-প্রান্তরে কৃষ্ণচূড়া ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। এখন তা অনেকটাই কমে গেছে। তাদের ভাষায়, এই গাছের কাঠ অর্থনৈতিকভাবে তেমন মূল্যবান নয়, ফলে বাণিজ্যিকভাবে রোপণের আগ্রহ কমে গেছে। পাশাপাশি নগরায়ন, সড়ক সম্প্রসারণ ও পরিকল্পনাহীন উন্নয়নও এর বড় কারণ।

সদর উপজেলার হাসলী এলাকার কৃষক হযরত আলী বলেন, ‘আগে রাস্তায় রাস্তায় এই লাল ফুল দেখা যেত। এখন অনেক কমে গেছে। কিন্তু যখন একটা গাছেও ফুল ফোটে, মনে হয় জমিনটা কথা বলে ওঠে। এই গাছ শুধু সৌন্দর্য না, আমাদের গ্রামের স্মৃতি।’

সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর তুহিন সুলতানা বলেন, ‘কৃষ্ণচূড়া একটি ক্রান্তীয় বৃক্ষ, যার বৈজ্ঞানিক নাম Delonix regia। এটি উচ্চ তাপমাত্রায় ভালোভাবে বেড়ে ওঠে এবং গ্রীষ্মকালে ফুলে ভরে ওঠে। ফুলগুলো বড় ও উজ্জ্বল লাল রঙের হয়, যা গাছজুড়ে এক অসাধারণ দৃশ্য তৈরি করে। এটি পরিবেশের জন্য উপকারী হলেও পরিকল্পিত সংরক্ষণ না হলে ভবিষ্যতে এর সংখ্যা আরো কমে যাবে।’

তবে আশার দিকও আছে। বানিয়াজুরী রিফাত নার্সারির মালিক আব্দুর রশিদ বলেন, ‘গত তিন-চার বছরে কৃষ্ণচূড়া ও সোনালু গাছের চারা বিক্রি বেড়েছে। এখন অনেকেই শখ করে বাড়ির আঙিনা ও রাস্তার ধারে বিশেষ কলমকৃত এই গাছ লাগাচ্ছে। প্রতিটি চারা ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’

পরিবেশ গবেষণা সংস্থা বারসিক-এর মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল রায় বলেন, ‘কৃষ্ণচূড়া বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও আবেগের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। এর সংখ্যা কমে যাওয়া উদ্বেগজনক। সৌন্দয্যবর্ধণকারী গাছের চারা রোপণের কাজ করে আসছি কয়েক বছর ধরে। তবে পরিকল্পিতভাবে এই গাছ রোপন কিংবা সংরক্ষণ না করলে এই রঙিন ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে।’

ঘিওর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তহমিনা খাতুন বলেন, ‘কৃষ্ণচূড়া গাছ শুধু সৌন্দর্য নয়, এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন কপরিবেশ বিষয়ক সংস্থার মাধ্যমে সড়কের ধারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এ ধরনের গাছ রোপণ করা হচ্ছে। মানুষকে আরো উৎসাহিত করা হচ্ছে।’

তপ্ত গ্রীষ্মের এই সময়ে কৃষ্ণচূড়া তাই শুধু একটি ফুল নয়, এটি এক নীরব ভাষা—যেখানে প্রকৃতি নিজের রঙে কথা বলে, মানুষের মনে ছুঁয়ে যায়, আর মনে করিয়ে দেয় হারিয়ে যেতে বসা এক রঙিন ঐতিহ্যের গল্প।