অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বলেছেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ কেবল একটি দলিল নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের পথরেখা। কারণ তরুণদের রক্তের বিনিময়ে এ সনদ রচিত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এই সনদ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই একটি জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি আরো সুদৃঢ় হবে।’
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ‘গণভোট-২০২৬ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘বাংলাদেশের তরুণরা ভবিষ্যতে যেন একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জীবনযাপন করতে পারে, সে লক্ষ্যেই তাদের লড়াই অব্যাহত রয়েছে। গণভোট সেই ধারাবাহিক সংগ্রামেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’
তিনি উল্লেখ করেন, “গণভোটে এমন কোনো বিষয় নেই যা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে না; বরং দেশের মানুষ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলতে প্রস্তুত।”
তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে গণভোটের মাধ্যমে সাংবিধানিক কাঠামোয় সরকারি কর্ম কমিশনকে (পিএসসি) স্বাধীন করতে হবে।’
একইসাথে তিনি অভিযোগ করেন, ‘গত ১৬ বছরে দুর্নীতি দমন কমিশনকে বিরোধী দল দমনের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছিল।’ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ও কার্যকর দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আলী রীয়াজ বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ যে পরিবর্তন চায় তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে আপনারা। আপনারা যখন ডাক দিয়েছেন, দেশের মানুষ তখন রাস্তায় নেমে এসেছে কী কারণে? এসেছে, কারণ তারা পরিবর্তন চায়, আপনাদের ওপর তারা আস্থা রেখেছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী ৩৭ বছরের নিচে। বাংলাদেশের যে ১৩ কোটি ভোটার আছে তার মধ্যে পৌনে ৫ কোটি ভোটারই হচ্ছে ৩৭ বছরের নিচে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ আপনাদের হাতে গড়া। সেজন্য আমি তরুণদের বলি, জুলাই জাতীয় সনদ শুধু একটা দলিল নয়, এটা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। কারণ এটা তরুণদের রক্ত দিয়ে তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের তরুণরা যাতে জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জীবনযাপন করতে পারে, নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, সুরক্ষিত হয় সেজন্য লড়াই অব্যাহত আছে। গণভোট হচ্ছে সেই লড়াইয়ের অংশ।’
শহীদদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যে বয়সেরই হই না কেন শহীদদের আত্মদানকে যদি আমরা যথার্থ মনে করি, যদি কোনো দায় অনুভব করি তবে দুই-পাঁচজনকে আপনি গণভোটের কথা বলুন। গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশে যে সুযোগ তৈরি হয়নি সে সুযোগ কাজে লাগানোর এখনই সময়।’
জুলাই যোদ্ধাদের কাছে আমাদের কি কোনো দায় নেই— এমন প্রশ্ন রেখে তিনি আরো বলেন, ‘জুলাইয়ে যারা আহত হয়েছে তারা অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারছে না, হয়তো কখনো পারবে না। যারা দেশের জন্য প্রাণ দিতে রাজি হয়েছিল তাদের জন্য আমাদের কোনো দায় থাকবে না এটা হতে পারে না। আমরা কি অপেক্ষা করব- সরকার কী বলবে, রাজনীতিবিদ কী বলবে, মঞ্জুরি কমিশন কী বলবে, এনজিও কী বলবে- তার জন্য?’
বাংলাদেশের পরিবর্তন চাইলে, সরকারি ঘোষণার ওপর নির্ভর না করে প্রত্যেককে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে গণভোটের প্রচার অংশগ্রহণ করতে তিনি সবাইকে অনুরোধ করেন।
৩০টি রাজনৈতিক দলের সাথে নয় মাস ধরে বহুবার আলোচনার পরেও গণভোটের প্রয়োজন হচ্ছে কেন- সে বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, ‘আমরা সকলে রাজনীতি করি না। সর্বোপরি সংবিধানের সাত অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের মালিক হচ্ছে জনগণ। তাদের সার্বভৌম অভিপ্রায়ের প্রকাশ ঘটেছে চব্বিশের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। আমরা আরেকবার সেই অভিপ্রায়ের প্রকাশ দেখতে চাই। যাতে ভবিষ্যতে এগুলো সুরক্ষা করা যায়। সেই সুরক্ষার জন্য, সেই প্রচেষ্টার জন্য আমাদের প্রত্যেকের ভূমিকা আছে।’
তিনি বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের ব্যালট সাদা আর গণভোটের ব্যালট গোলাপি কালার। গণভোটের মার্কা হচ্ছে টিক চিহ্ন। যারা শুধু মার্কা দিয়ে বুঝতে চায়, তাদের সেটাই বোঝান। এই সুযোগ হেলায় হারানো যাবে না, অনেক প্রাণ, অনেক আত্মদান এবং অনেক কিছুর বিনিময়ে আমরা এটি পেয়েছি।’
তিনি আরো বলেন, “যারা ওই সময় ভূমিকা রেখেছেন তারা ভূমিকা অব্যাহত রাখবেন আর যারা ওই সময় ভূমিকা রাখতে পারেননি তাদের কাছে আমার অনুরোধ আপনাদের জন্য আরেকবার সুযোগ তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশকে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রে পরিণত করার। সেই চেষ্টায়, সংগ্রামে, যুদ্ধে ও লড়াইয়ে আপনারা যুক্ত হন। সকলে মিলে চেষ্টা করলে আমরা অবশ্যই পারবো। আমরা একটা ফ্যাসিস্ট সরকারকে সরাতে পেরেছি, তাকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছি। মানুষের মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষা আছে সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। সকলে যদি সহযোগিতা করেন তাহলে এটা আমরা সাফল্যমণ্ডিত করতে পারব। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে প্রস্তুত হয়ে আছে।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. মো: আনোয়ার হোসেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রো-ভিসি ড. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, ছাত্র প্রতিনিধি, আহত জুলাই যোদ্ধারা, জুলাই শহীদ সাকিব আনজুমের বাবা মো: মাইনুল হক প্রমুখ সভায় বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সুধীজন উপস্থিত ছিলেন।



