বড় ভাই রমজান আলী

আবু সাঈদ যে কারণে জীবন দিলো, তা বাস্তবায়নের কোনো আলামত দেখছি না

রাজনৈতিক দলগুলোর কামড়াকামড়ির কারণে প্রধান উপদেষ্টা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না।

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর ব্যুরো
শহীদ আবু সাইদ
শহীদ আবু সাইদ |ইন্টারনেট

শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার বাদি বড় ভাই রমজান আলী অভিযোগ করেছেন, প্রধান উপদেষ্টা প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সবাই আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করে গেছে। বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছে। কিন্তু আজও ভাই হত্যার বিচারের কোনো আলামত নেই। আমার ভাই আবু সাঈদ যে কারণে জীবন দিলো, তা বাস্তবায়নের কোনো আলামত দেখছি না

আবু সাঈদের প্রথম শাহাদত বার্ষিকীতে পীরগঞ্জের বাবুনপুরের নিজ বাড়িতে তিনি এসব কথা বলেন।

রমজান আলী বলেন, ‘আজকে জুলাইয়ের ১৬ তারিখ। সরকারিভাবে শহীদ দিবস ঘোষণা করা হয়েছে। আমি সকল শহীদের জন্য দোয়া কামনা করি। এবং যারা আহত ভাইয়েরা আছেন, তাদের জন্য দোয়া কামনা করি।’

ভাই হত্যার বিচারের গতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে রমজান বলেন, ‘আমার ভাই বাংলাদেশে যে বৈষম্যের কারণে জীবন দিলো। দেশের একটা নতুন স্বাধীনতা এলো। এই স্বাধীনতার কোনো আলামত আমরা এখনো দেখতে পাইনি। কেননা আজকে এক বছর পেরিয়ে গেলো, কেননা আমার ভাই পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে হত্যা হলো। দেশে ও দেশের বাইরের সমস্ত মানুষ জানে পুলিশের গুলিতে নিহত, এটা স্পষ্ট। তার বিচারের এখনো কোনো অগ্রগতি আমরা পাইলাম না। এই দুঃখের কথা কার কাছে বলব। এই বাংলাদেশের কোন মানুষের কাছে বলব। বলার ভাষা আমাদের নেই।’

প্রধান উপদেষ্টাসহ সবার কাছেই তার চাওয়ার কথা উল্লেখ করে রমজান আলী বলেন, ‘আমাদের বাসায় প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে সরকারের যত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আসছিল এবং বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি তিনিও আমাদের বাসায় আসেন। সবার কাছে আমরা চেয়েছিলাম শুধু আমার ভাই হত্যার বিচার। কিন্তু এক বছরে আমরা এই বিচারের কোনো অগ্রগতি পাইনি। আমরা খুব দুঃখিত এবং আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে শোকাহত। বলবার মতো আমাদের আর ভাষা নেই।’

আবু সাঈদের কারণে এখন মুক্ত বাতাসে সবাই কথা বলতে পারছে উল্লেখ করে রমজান বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কারণে আমরা যে বাংলাদেশ, যে নতুন স্বাধীনতা পেয়েছি। অনেক ভাই আমাদের বাসায় এসে বাবার পা ধরে কান্নাকাটি করেছে। বলেছে যে আজকে আমরা আপনার ছেলের কারণেই মুক্ত। এই বাংলাদেশে হয়তো বা কোনোদিন সূর্যের আলো দেখতাম না। অনেকে বলেছে আমার ফাঁসির আদেশ হয়েছিল, সেখান থেকে আমি বেঁচে আসছি। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের কোনো পরিবর্তন দেখিনা। বর্তমানে বিচারের যে কাঠামো কার্যক্রম, বিচারগুলো যে সেভাবে হবে কোনো কিছু দেখছি না।’

রাজনৈতিক দলগুলোর কামড়াকামড়ির কারণে প্রধান উপদেষ্টা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না উল্লেখ করে রমজান আলী বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা শুধু বাংলাদেশে সম্মানিত না, উনি বিশ্বের একজন সম্মানিত ব্যক্তি। তাকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে কামড়াকামড়ি করছে। তাকে কাজ করার কোনো সুযোগ দিচ্ছে না। তাকে যদি যথাযথভাবে কাজের সুযোগ এবং সময় দেয়া যায়, এই বাংলাদেশের যে একটা সংস্কার কাঠামো আছে, এটা করে পরবর্তীতে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন এবং মানুষের যে নির্বাচনের অধিকার সেটা ফিরে পাবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যে মারামারি হানাহানি চলছে, সংস্কারের মাধ্যমে এগুলো কন্ট্রোলে আসবে। কিন্তু তিনি কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না।’

সংবিধান সংশোধন, সংস্কার, বিচার, দৃশ্যমান হওয়ার পরই নির্বাচন প্রয়োজন দাবি করে তিনি বলেন, ‘দেশের যেহেতু পরিবর্তন হয়েছে। সংবিধানও পরিবর্তন হওয়া দরকার। সংবিধান পরিবর্তন করে এবং সংবিধানের সেই ধারাবাহিকতা অনুযায়ী দেশকে সংস্কার করলে এদেশে সুষ্ঠু একটি নির্বাচন ও মানুষের যে অধিকার তা মানুষ ফিরে পাবে। এবং আবু সাঈদ যে আলো দেখিয়ে গিয়েছে, বৈষম্যমুক্ত একটি বাংলাদেশ দেখতে পাবো।’

গত বছর ১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তার মৃত্যুর পর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান সেই সময়কার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। বীরগঞ্জের বাবনপুরে শহীদ আবু সাইদের কবর জিয়ারত করবেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিক্ষা উপদেষ্টা প্রফেসর ড. রফিকুল আকবর, বন ও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডক্টর এস এম এ ফায়েজ, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. শওকত আলীসহ কর্মকর্তাবৃন্দ। এছাড়াও দিনভর সেখানে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো কবর জিয়ারত ছাড়াও নানা কর্মসূচি নিয়েছে।

সকাল ১০টায় আবু সাঈদের বিশ্ববিদ্যালয় রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কালোব্যাচ ধারণার পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হবে শোকযাত্রা। এরপর আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন হবে ক্যাম্পাসে। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন শহীদ আবু সাঈদের গর্বিত পিতা মকবুল হোসেন। বিশেষ অতিথি থাকবেন রংপুরের শহীদ পরিবার। পরে ক্যাম্পাসের এক নম্বর গেটে শহীদ আবু সাঈদ তোরণ এবং পার্কের মোড়ে আবু সাঈদ মিউজিয়ামের উদ্বোধন করবেন অতিথিবৃন্দ।