সিলেট নগরীর রায়নগরে নৃশংস ট্রিপল মার্ডারে নিহত ব্যবসায়ী মো: আব্দুস সাত্তার ও তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বাদ আসর নগরীর ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ ময়দানে তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষের ঢল নামে। ইমামতি করেন শাহজালাল (র:) দরগাহ মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফিজ মাওলানা আসজাদ আহমদ।
জানাজার আগে নিহত দম্পতির ছেলে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আরিফ ইফতেখার ও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী মুসল্লিদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন।
আরিফ ইফতেখার তার বাবা-মায়ের কারো সাথে কোনো ভুল হয়ে থাকলে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করেন। একইসাথে তার বাবা-মায়ের কাছে কারো কোনো পাওনা থাকলে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান।
বাবা-মায়ের জানাজায় অংশ নিতে দেশে ফিরে আসা সন্তানদের কান্নায় এ সময় হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দুই মেয়ের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছিল রায়নগরের পরিবেশ। শুক্রবার সেই কান্নার সাথে যুক্ত হয় যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এক ছেলে ও এক মেয়ের বুকফাটা আহাজারি।
কফিন আঁকড়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন তারা। সন্তানদের কান্না ও আহাজারিতে শাহী ঈদগাহ ময়দানসহ আশপাশের এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। স্বজনদের সান্ত্বনাতেও থামছিল না তাদের কান্না। হৃদয়বিদারক এ দৃশ্যে উপস্থিত অনেকের চোখেও পানি চলে আসে।

সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গভীর নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘শান্তির নগরী হিসেবে পরিচিত সিলেটে অতীতে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা খুব কমই ঘটেছে।’
তিনি জানান, ঘটনার খবর পাওয়ার পর তিনি তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে গিয়েছেন এবং হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারে পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। অল্প সময়ের মধ্যে আসামিকে গ্রেফতার করায় তিনি সিলেট মহানগর পুলিশকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের সাথে আরো কেউ জড়িত আছে কি-না, তা গুরুত্বের সাথে তদন্ত করতে হবে। ঘটনার নেপথ্যে কেউ থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনতে হবে।’ দ্রুতবিচার আদালতের মাধ্যমে মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তি করে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করারও দাবি জানান তিনি।
জানাজায় অংশ নেন মেক্সিকোয় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, জেলা আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং বিপুলসংখ্যক সাধারণ মুসল্লী।
জানাজা শেষে আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের লাশ নয়াসড়কস্থ মানিকপীর (র:) কবরস্থানে নিয়ে দাফন করা হয়।
অন্য কারণও খতিয়ে দেখছে পুলিশ
আলোচিত নৃশংস ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় গ্রেফতার বাবুল মিয়ার সাথে নিহত গৃহকর্মী তাহমিনার প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এলেও এটিকেই হত্যাকাণ্ডের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছে না পুলিশ। ঘটনার নেপথ্যে সম্পত্তি, পারিবারিক বিরোধ, আর্থিক লেনদেন কিংবা অন্য কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় ছিল কি-না, এসব দিকও গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর বাসার কয়েকটি আলমারি ও ওয়ারড্রোব খোলা পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থল থেকে তিন পাতার একটি দলিলসদৃশ কাগজও উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আলামতের সাথে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি-না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি বাসার বেসিন, হাত ধোয়ার স্থান, একটি ব্যাগ ও বারান্দায় পাওয়া রক্তের চিহ্নও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
লোডশেডিংয়ের কারণে সিসিটিভির গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময়ের ফুটেজ না থাকলেও তদন্তে পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজ, আলামত ও পারিপার্শ্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করছে পুলিশ। হত্যায় ব্যবহৃত ছোরার ধাতব অংশে শুকনো রক্তের দাগ পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলের রক্তের নমুনার সাথে ছোরায় থাকা রক্তের নমুনা মিলিয়ে দেখতে তা ফরেনসিক পরীক্ষায় পাঠানো হচ্ছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর ও প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডের পর ছোরাটি একটি খালি জায়গায় ফেলে দেয়ার কথা জানান। বুধবার (১২ আগস্ট) সন্ধ্যায় তল্লাশি চালিয়ে এটি না পাওয়া গেলেও বৃহস্পতিবার সকালে পুনরায় অভিযান চালিয়ে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্বপরিচিত হওয়ায় বুধবার সকালে বাবুল ওই বাসায় যান। সেখানে গৃহকর্মী তাহমিনার সাথে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। তাহমিনার চিৎকার শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকে এবং পরে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। তিনজনকে হত্যার পর বাবুল বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার বাবুল মিয়াকে আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছোরাটি উদ্ধার করা হয়।
মামলা দায়েরের প্রস্তুতি
নিহত দম্পতির ছেলে আরিফ ইফতেখার কোতোয়ালী থানায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিয়েছেন। মামলায় হত্যাকাণ্ডের কারণ, জড়িত ব্যক্তি ও ঘটনার নেপথ্যের বিষয়গুলো তদন্তে গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, নিহত আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের চার সন্তানই প্রবাসে বসবাস করেন। তাদের দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে ও এক মেয়ে ও একমাত্র ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। বাবা-মায়ের হত্যার খবর পেয়ে সন্তানরা একে একে দেশে ফেরেন।
গৃহকর্মী তাহমিনার দাফন সম্পন্ন
এদিকে এ হত্যাকাণ্ডে নিহত গৃহকর্মী তাহমিনার (১৫) দাফন বৃহস্পতিবার রাতে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার সদর ইউনিয়নের রায়নগর গ্রামের বাড়িতে সম্পন্ন হয়েছে। রাত ৯টার দিকে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।
তাহমিনার বাবা আপ্তাব মিয়া দিনমজুর। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল সবার বড়। পরিবারের আর্থিক সঙ্কটের কারণে অল্প বয়সেই কাজে নামতে হয় তাকে। কোরবানির ঈদের পর সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ওই বাসায় গৃহকর্মীর কাজ শুরু করেছিল তাহমিনা।
শুক্রবার সন্ধ্যা ৮টায় এসএমপির কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মোহাম্মদ মাইনুল জাকির দৈনিক নয়া দিগন্তকে জানান, এখন পর্যন্ত মামলা দায়েরের জন্য নিহতের পরিবারের কেউ আসেনি। তবে আসার কথা রয়েছে। কখন আসবেন সেটা নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না।
উল্লেখ্য, বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলা থেকে আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনার গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দিলে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরে ওই দিন বিকেলে রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার একটি কলোনি থেকে বাবুল মিয়াকে আটক করে পুলিশ।
পরদিন তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত ছোরাটি উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে গৃহকর্মীর সাথে প্রেমের সম্পর্কের পাশাপাশি সম্পত্তি, পারিবারিক বিরোধ, আর্থিক লেনদেনসহ সম্ভাব্য অন্যান্য কারণ সামনে রেখে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।



