কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর সীমান্তবর্তী শিলখুড়ি ইউনিয়নের শালজোড়ের কয়েক হাজার মানুষকে একটি সেতুর জন্য যুগের পর যুগ চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে কালজানী নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন শিলখুড়ি ইউনিয়নের শালজোড় এলাকা। এই এলাকার হাজার হাজার মানুষকে বারোমাস জানমালের ঝুঁকি নিয়ে নদী পাড় হয়ে হাটবাজার, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা সদর এমনকি জেলা শহরে যেতে হয়। এতে সময় নষ্ট ও আর্থিক ক্ষতি হয়। সেতু অভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ওই এলাকার উন্নয়ন। দেশের সরকারের পরিবর্তন হলে শালজোড়ের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন ও ভারতীয় সীমান্ত লাগোয়া হওয়ার শালজোড়ের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
অর্ধশতাব্দীর অধিক সময় ধরে নদী বিচ্ছিন্ন এলাকায় বসবাস করা বৃদ্ধ বেলাল হোসেন বলেন, ‘বাপ-চাচারা পাল তোলা নৌকা ও লগি-বৈঠার সাহায্যে ডিঙ্গি নৌকায় কালজানী নদী পার হতেন। বর্তমানে ডিজেল ইঞ্জিনের নৌকা দিয়ে নদী পার হচ্ছি। দয়া-ধর্ম করে নদীর ওপারে একটা ব্রিজ দিলে উপকার হতো।’
আব্দুল মোতালিব বলেন, ‘প্রতিদিন নৌকায় নদী পারাপারের ঝুঁকি, পায়ে হাঁটার ঝামেলা ও যানবাহন সমস্যা কারণে এখানকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দ্রুত বদলি নিয়ে অন্যত্র চলে যান। শিক্ষক স্বল্পতার কারণে পিছিয়ে পড়া এই এলাকার শিশুরা শিক্ষা ক্ষেত্রে আরো পিছিয়ে পড়ছে। সেতু না থাকায় শিক্ষার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।’
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা অর্জনের জন্য নদী বিচ্ছিন্ন এলাকার ছেলেমেয়েদের প্রতিদিন নৌকায় নদী পাড়ি দিয়ে স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় যেতে হয়। প্রাথমিকের পরেই থেমে যায় অধিকাংশ মেয়ে শিশুর উচ্চ শিক্ষা। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে শিশুদের উচ্চ শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বাল্যবিয়ের সংখ্যা বাড়ছে।
আব্দুল খালেক বলেন, ‘ফসল হাট-বাজারে বিক্রি করার জন্য নিতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। সার, বীজ, তেল ও কীটনাশক আনতে ব্যয় বাড়ে। পরিবহণ সমস্যার কারণে ফসল কম দামে বিক্রি করতে হয়। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়। সেতু থাকলে এই সমস্যা থাকতো না।’
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক ও সাবেক ইউপি সদস্য ইসরাফিল হোসেন বলেন, ‘রাতে কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে মহাবিপদে পড়তে হয়। সেতু না থাকায় অসুস্থ ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসা কেন্দ্রে নেয়া সম্ভব হয় না। চিকিৎসা কেন্দ্রে নেয়ার পথে কালজানী নদীর ঘাটে অসুস্থ মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনা যেমন আছে, তেমনি বরযাত্রী নিয়ে নৌকা ডুবির ঘটনাও আছে। এছাড়া কালজানী নদীতে প্রতিনিয়তই ছোটখাটো নৌদুর্ঘটনা ঘটে।’
সাইফুর রহমান বলেন, ‘নৌকার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাটে বসে থাকতে হয়। জরুরি প্রয়োজনে নদী পার হতে দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হয়। রাত ১০৯টার পর নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তখন আর বাড়ি ফেরা সম্ভব হয় না। অনেক সময় দশ টাকার নৌকা ভাড়া ১০০ থেকে ৫০০ টাকা দিতে হয়। এমনও হয় ১০০০ টাকাও দেয়া লাগে।’
আব্দুল মালেক বলেন, ‘সেতু না থাকায় এখানে বসবাস করা পরিবারের ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিতেও সমস্যা পড়তে হয়। যাতায়াত সমস্যার কারণে অনেকেই এখানকার মানুষের সাথে আত্মীয়তা করতে চান না।’
স্থানীয় বাসিন্দা মামুন বলেন, আমাদের এলাকাটির তিন দিকে নদী আর একদিকে ভারত। দেশের যেকোনো সীমান্তে উত্তেজনা দেখা দিলে আমরা আতঙ্কে থাকি।
শহীদ আলী বলেন, ‘ছেলেমেয়ে বর্ষাকালে ভরা নদী ডিজেল ইঞ্জিনের নৌকা দিয়ে যাতায়াত করে তখন ভয়ে বুক ধুকপুক করে। কালজানী নদীতে একটা সেতু হলে নদী পারাপার নিয়ে আর দুঃশ্চিন্তা থাকতো না। মরার আগে কালজানির ওপর একটা সেতু দেখে যেতে পারলে শান্তি পেতাম।’
আবু সাইদ বলেন, ‘উপজেলা সদরের সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ না থাকায় এখানকার রাস্তা ঘাটের তেমন উন্নয়ন হয়নি। মালামাল আনা-নেয়া ক্ষেত্রে ঘোড়ার গাড়ি ও ব্যাটারি চালিত ভ্যান গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হয়। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে বাইসাইকেল ও মোটরসাইকেলই একমাত্র ভরসা।’
আব্দুস সালাম বলেন, ‘সেতুর না থাকায় নদী বিচ্ছিন্ন এলাকার মানুষ বিভিন্ন ধরণের জরুরি নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত নাগরিক সেবা পৌছানো সম্ভব হয় না।’
কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘নদী বিচ্ছিন্ন এলাকার মানুষ দীর্ঘদিনের দাবিটি সংশ্লিষ্ট দফতরের নজরে আনা হবে।’
ভূরুঙ্গামারীর কালজানী নদীর ওপার দ্রুত একটি সেতু নির্মাণ করা হোক এমনটাই দাবি স্থানীয়দের।



