উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে উত্তরের জনপদ গাইবান্ধার নদ-নদীগুলোতে পানি কখনো বাড়ছে, কখনো কমছে। তবে পানি কমার সাথে সাথে বেড়েছে স্রোতের তীব্রতা। এর প্রভাবে জেলার তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, করতোয়াসহ বিভিন্ন নদীতে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন। এরই মধ্যে বাঙ্গালী নদীর ভাঙনের মুখে পড়েছে সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী এলজিইডির প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ত্রিমোহনী সেতু। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া না হলে সেতুর সংযোগ সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সরেজমিনে ত্রিমোহনী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে পানি অনেকটা কমেছে। তবে স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় বাঙ্গালী নদীর তীরে ভাঙন শুরু হয়েছে। সেই ভাঙন ত্রিমোহনী সেতুর পাশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
ত্রিমোহনী সেতুর পাশের বাসিন্দা শিউলি বেগম বলেন, ‘রাত হলে ঘুম আসে না। কখন যে নদীতে ঘরবাড়ি ভেঙে যায়, সেই আতঙ্কে থাকি। কত মানুষ আসে-যায়, কিন্তু কেউ আমাদের খোঁজ নেয় না। নদীভাঙন রোধে কেউ কোনো উদ্যোগও নেয়নি।’
রামনগর গ্রামের মকবুল ইসলাম বলেন, ‘বাঙ্গালী নদীর ত্রিমোহনী ঘাট এলাকায় সিসি ব্লক না বসানোর কারণে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। যেকোনো সময় স্রোতের তোড়ে সেতুর একাংশ নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে।’
একই গ্রামের মোকছেদুর রহমান বলেন, ‘নদীভাঙনের কারণে গ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কও হুমকির মুখে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সড়কটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।’
স্থানীয় জাহিদুল ইসলাম, হাবিজার রহমান ও আব্দুল মতিন জানান, কয়েক মাস ধরেই ত্রিমোহনী সেতু এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। সংযোগ সড়কটি ভেঙে গেলে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের সাথে সাঘাটার বোনারপাড়া ও কচুয়া ইউনিয়নের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এতে হাজারো মানুষকে দুর্ভোগে পড়তে হবে।
কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য ফরমান আলী বলেন, ‘ত্রিমোহনী সেতুর দুই পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ড সিসি ব্লক বসালেও গত সাত বছরে সেতুর নিচের অংশে সিসি ব্লক বা জিওব্যাগ ফেলা হয়নি। এ কারণেই বর্তমানে ওই স্থানে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে।’
সাঘাটা উপজেলা কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাগিস আক্তার বলেন, ‘ত্রিমোহনী সেতু সংলগ্ন রামনগর গ্রামের ভাঙনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দফতরকে অবহিত করা হবে।’
কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খন্দকার বলেন, ‘গোবিন্দগঞ্জ ও সাঘাটা উপজেলার সংযোগকারী ত্রিমোহনী সেতুর পাশে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না নেয়া হলে সেতুর সংযোগ সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল কবীর বলেন, ‘ত্রিমোহনী সেতু সংলগ্ন নদীভাঙনের বিষয়টি জেনেছি। সংশ্লিষ্ট দফতরের নাখে সমন্বয় করে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হবে। ভাঙনের ঝুঁকি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।’
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর কাউনিয়া (সুন্দরগঞ্জ) পয়েন্টে পানি ১২ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৯২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফুলছড়ি পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর পানি ১৭ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১২১ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। ঘাঘট নদীর পানি ২১ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১৬৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। করতোয়া নদীর কাটাখালী পয়েন্টে পানি ৬৪ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ২৯৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘নদীভাঙন রোধে জেলার বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে কাজ চলমান রয়েছে।’
গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছ বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে।’



