দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ৩১ হাজার কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারীর দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপন প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। মঙ্গলবার প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়া হয়।
ইআরএল সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আওতাধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারী পিএলসির (ইআরপিএলসি.) পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ অনুষ্ঠিত একনেক সভায় অনুমোদিত ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারী লিমিটেড শীর্ষক প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ প্রদান করা হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের মোট অনুমোদিত ব্যয়একত্রিশ হাজার কোটি সাতান্ন লাখ টাকার মধ্যে ৬০% বাংলাদেশ সরকার-জিওবি অর্থায়ন ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি ৭৩ লাখ ৭২ হাজার টাকা এবং ৪০% বিপিসির নিজস্ব অর্থায়ন ১২ হাজার ৪৩৩ কোটি ৮৩লাখ ২৮ হাজার টাকা।
সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা ৭০ লাখ মেট্রিক টন। তন্মধ্যে ১৫ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত (ক্রুড অয়েল) তেল ইস্টার্ন রিফাইনারীর মাধ্যমে পরিশোধন করা হয়। দেশের একমাত্র এই জালানি তেল পরিশোধনাগারটি চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত (ক্রুড অয়েল) তেলের মূল্য কম হলেও ১৫ লাখ মেট্রিক টনের বেশি পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন রিফাইনারি না থাকায় অবশিষ্ট ৫৫ লাখ মেট্রিক টন পরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি মূল্যে আমদানি করতে হয়।
মূলত বাংলাদেশে রিফাইনারি বা পরিশোধন কারখানার সক্ষমতা কম থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম কমে গেলেও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ক্রুড অয়েল ক্রয় করে মজুদ করা সম্ভব হয় না। ফলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে এর প্রভাব সরাসরি স্থানীয় বাজারে অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকায় তা পরিশোধন করে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হলে এ খাতে একদিকে যেমন আমদানি বাবদ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হতো অপরদিকে আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পেতো। কিন্তু আমাদের রিফাইনারি বা পরিশোধন কারখানার সক্ষমতা কম থাকায় ১৫ লাখ মেট্রিক টনের চেয়ে বেশি ক্রুড অয়েল আমদানি করা সম্ভব হয় না।
এ প্রেক্ষাপটে, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি নির্ভরতা হ্রাস এবং কম মূল্যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ক্রয় করে তা প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করার লক্ষ্যে বিপিসি কর্তৃক বার্ষিক ৩০ লাখ মেট্রিক টন ক্রূড অয়েল পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি রিফাইনারি স্থাপনের লক্ষে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ডিপিপি প্রণয়ন সংক্রান্ত কার্যক্রম ২০০৮ সালে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
অন্তবর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
ইআরপিএলসি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান ইস্টার্ন রিফাইনারীর মাধ্যমে দেশের মোট চাহিদার মাত্র ২০% পূরণ করা সম্ভব হয়। অবশিষ্ট ৮০% পেট্রোলিয়াম জাতীয় পণ্য বিদেশ থেকে উচ্চ মূল্যে আমদানি করতে হয়। ইস্টার্ন রিফাইনারীতে মাত্র ৩০-৪০ দিনের জন্য জ্বালানি তেল সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। অথচ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কমপক্ষে ৬০ দিনের জ্বালানি তেল মজুদ থাকা জরুরি।
সূত্রমতে, প্রকল্পটিতে বিনিয়োগকৃত অর্থ ৫ বছরের মধ্যেই ফেরত পাওয়া যাবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার ৪৫-৫০% পূরণ করা সম্ভব হবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব ইউরো-৫ মানের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপন্ন হবে, যাতে সালফারের পরিমাণ হবে ১০ পিপিএম এর চেয়ে কম, যা পরিবেশ বান্ধব হিসেবে বিবেচিত।



