জামায়াতে ইসলামীর জেনারেল সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জামায়াতকে কুফুরি আখ্যা দেয়া হয়েছে, যা দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিভ্রান্তিকর।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি এখন ৭১-এর অবস্থান তুলে জাতিকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করছে। বিএনপির সাথে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জামায়াত জঙ্গি। অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে থাকা ছিল জামায়াতের তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থান। কিন্তু স্বাধীনতার পর জামায়াত দেশের পক্ষেই কাজ করছে।’
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকালে খুলনা মহানগরীর উপকণ্ঠ আরাফাত এলাকায় আয়োজিত এক নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নাম উল্লেখ না করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘কোনো একজন মুসলমান, যিনি আল্লাহ ও রাসূলকে বিশ্বাস করেন, আখেরাত বা পরকালে বিশ্বাসী, তাকে কাফের বলা, কুফরি বলা জায়েজ না। উনি একটা বড় অপরাধ করেছেন। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কাজটা সৌজন্যতা-শিষ্টাচারবোধের সাথে যায় না। এটার জন্য আমরা তীব্র প্রতিবাদ করি।’
‘ইসলাম সম্পর্কে যারা পড়াশুনা করেছেন, যারা স্কলার, যারা পন্ডিত, যারা ফকিহ, যারা মুফতি তারা মুসলমানদের কোনো ভুলত্রুটির ব্যাপারে কথা বলতে পারেন। কিন্তু তিনি তো এটার অধিকার রাখেন না। তিনি রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে পারেন। একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানকে কখনো কাফের বলতে পারেন না-এটা হাদিসে পরিষ্কার উল্লেখ করা আছে। তিনি বড় একটা অপরাধ করেছেন, এজন্য তিনি যেন আত্মসমালোচনা করেন,’ বলেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে দ্বীন কায়েমের নিয়মতান্ত্রিক জিহাদ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অস্ত্রের যুদ্ধের পরিবর্তে ব্যালটের মাধ্যমেই রাষ্ট্রক্ষমতা ও আইন পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং এটিই বর্তমান সময়ের সংগ্রামের পথ।’
তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগের নির্যাতনের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ‘মক্কার কুরাইশদের অত্যাচারের মধ্যেও নবী মুহাম্মদ সা: দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে সরে যাননি।’
‘ইসলাম কেবল নামাজ, রোজা, ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠাই ইসলামের মূল উদ্দেশ্য,’ বলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘সহিংসতা, সন্ত্রাস ও জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল ইসলাম সমর্থন করে না এবং জামায়াতে ইসলামী নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই রাষ্ট্র ও সরকার পরিবর্তনের পক্ষে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনে পাঁচটি ইসলামী দল, জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা, যারা রাজনীতিতে কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরাচারকে বিদায় দেয়ার জন্য, পেটোয়া বাহিনীর গুলির ভেতরে বুক পেতে দিয়ে জীবন দিয়েছিল, সেই জুলাই যোদ্ধারা, সেই তরুণরা একটা দল গঠন করেছে। সেটা হচ্ছে, জাতীয় নাগরিক পার্টি-ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি, যাকে বলা হয় এনসিপি, তারাও এই দশ দলের মধ্যে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের বীর বিক্রম কর্নেল অলি আহমেদের নেতৃত্বাধীন দলসহ মোট ১০টি দল একত্র হয়ে জোট গঠন করেছে। এই জোটে ইসলামী চেতনা, জুলাই আন্দোলনের চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সমন্বয় ঘটেছে।’
তিনি বলেন, ‘৩০০ সংসদীয় আসনের জন্য জোটের মধ্যে আসন বণ্টন সম্পন্ন হয়েছে এবং খুলনা-৫ আসনে জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকেই প্রার্থী করা হয়েছে। জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সাহস পেলে তিনি দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এগিয়ে নিতে প্রস্তুত।’
তিনি বলেন, ‘সৎ লোক নির্বাচিত হলে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দমন-পীড়ন বন্ধ হবে বলেই কিছু মহল জামায়াতের বিরোধিতা করছে।’
তিনি দাবি করেন, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকার করে এবং তাদের গঠনতন্ত্রে মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামী বা ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের কোনো প্রমাণ নেই।’ বরং তিনি বিভিন্ন সরকারের বিরুদ্ধে ভারতের সাথে করা চুক্তির মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগ তোলেন।
তিনি বলেন, ‘গত ৫৪ বছরে যারা দেশ শাসন করেছে, তাদের কেউই দুর্নীতিমুক্ত শাসনের দাবি করতে পারবে না।’
তিনি আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে একযোগে দায়ী করে বলেন, ‘প্রত্যেক সরকারের আমলেই দুর্নীতি, দলীয়করণ ও বিরোধী দমননীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’
তিনি ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘ভোট কেনার জন্য দেয়া কালো টাকা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। টাকা দিয়ে মানুষের বিবেক কেনা যায় না এবং ভোট বিক্রি করা মানে ভবিষ্যৎ বিক্রি করা।’
ভোট কেনার উদ্দেশ্যে দেয়া অর্থ-সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার পরামর্শও দেন তিনি।



