পুকুর লিজের টাকা না দেয়ায় জের

ঝিনাইদহে ‘যৌন হয়রানির’ অভিযোগে স্কুলে ঢুকে শিক্ষকের ওপর হামলা

শিক্ষক শাহ আলমের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে দেয়া ছাত্রীর হাতে লেখা বলে দাবি করা একটি ‘স্বাক্ষরবিহীন’ চিঠি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে বাদীপক্ষের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে চিঠিটি ছাত্রীর লেখা নয় বলে জানিয়েছেন তার চাচা সৌরভ সরকার।

কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) সংবাদদাতা

Location :

Kaliganj
কালীগঞ্জ উপজেলার বড় বায়সা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে হামলাকারীরা
কালীগঞ্জ উপজেলার বড় বায়সা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে হামলাকারীরা |সংগৃহীত

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে এক স্কুলশিক্ষককে মারধর ও অবরুদ্ধ করার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। হামলার শিকার সহকারী শিক্ষক শাহ আলমের পরিবারের অভিযোগ, স্কুলের পুকুর লিজের টাকা স্থানীয় প্রভাবশালী সাবেক ইউপি সদস্য ইলিয়াস মোল্লাকে না দেয়াকে কেন্দ্র করে ওই শিক্ষকের সাথে তার বিরোধ চলছিল। এর জেরে গত দুই সপ্তাহ ধরে শিক্ষককে বিভিন্নভাবে হেনস্তা ও হয়রানির হুমকি দেয়া হচ্ছিল।

এদিকে শিক্ষক শাহ আলমের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে দেয়া ছাত্রীর হাতে লেখা বলে দাবি করা একটি ‘স্বাক্ষরবিহীন’ চিঠি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে বাদীপক্ষের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে চিঠিটি ছাত্রীর লেখা নয় বলে জানিয়েছেন তার চাচা সৌরভ সরকার। ঘটনাটি নিয়ে জেলা জুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।

এ ঘটনায় শিক্ষক শাহ আলমের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে। তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে পুলিশ পাহারায় ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কালীগঞ্জ থানার ওসি কবির হোসেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার কালীগঞ্জ উপজেলার বড় বায়সা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহ আলমকে স্কুলের অফিসকক্ষে ঢুকে ১৫-২০ জন স্থানীয় ব্যক্তি মারধর করেন। বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে এ হামলা চালানো হয়। স্থানীয় সৌরভ সরকার, বাবু, হাশিদুলসহ কয়েকজন হামলায় নেতৃত্ব দেন বলে স্থানীয় সূত্র, ভিডিওচিত্র এবং শিক্ষকের স্বজনদের কাছ থেকে জানা গেছে।

মারধরের পর শিক্ষককে অফিসকক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। খবর পেয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ওসি ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন। পরে পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। সন্ধ্যার দিকে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হামলার নেপথ্যে পূর্ববিরোধ
শিক্ষকের ওপর হামলার নেপথ্যে পূর্ববিরোধের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, বড় বায়সা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘটনাটি ঘটলেও এর আগে বিদ্যালয়ের আশপাশের লোকজন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। মঙ্গলবার পাশের রামচন্দ্রপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য ইলিয়াস মোল্লা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদকে ডেকে সহকারী শিক্ষক শাহ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি জানান। এর কিছুক্ষণ পরই স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষে ঢুকে ওই শিক্ষকের ওপর হামলা চালায়। এসময় হামলাকারীরা শাহ আলমের বুকের ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে বলে অভিযোগ রয়েছে।

হামলার পর শিক্ষকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঘিরে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তোলা হয়। পরে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে শিক্ষার্থীর হাতে লেখা বলে দাবি করা একটি অভিযোগপত্র দেয়া হয়। তবে ওই সময় কথিত ভুক্তভোগী ছাত্রী ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল না।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে হামলার শিকার শিক্ষক শাহ আলম বলেন, “আমি বিদ্যালয়ে এসে হঠাৎ শুনি, আমি নাকি এমন একটি কাজ করেছি। পরে প্রধান শিক্ষক ওই ছাত্রীর বাড়িতে বিস্তারিত জানতে যান। তিনি বিদ্যালয়ে ফিরে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই ১৫-২০ জন আমাকে বেধড়ক মারধর করেন। আমি একজন শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের সাথে কীভাবে আমি আপত্তিকর আচরণ করব, সেটাই বুঝতে পারছি না। কেউ আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করবে, তা আমি ভাবতেও পারিনি।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান বলেন, ‘ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, উত্তেজিত স্থানীয় লোকজন শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। তারা শিক্ষকের শাস্তি দাবি করছিলেন। তখন আমি ছাত্রীর চাচাসহ উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে লিখিত অভিযোগ চাই। পরে তারা ঘটনাস্থল থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে সাদা কাগজে হাতে লেখা একটি অভিযোগপত্র এনে দেন। সেখানে ছাত্রীর কিংবা তার পক্ষ থেকে কারো স্বাক্ষর ছিল না।’

তিনি বলেন, ‘চিঠিটি ওই শিক্ষার্থীর নিজের হাতে লেখা কি না, তা আমি নিশ্চিত নই। ছাত্রীও আমার সামনে এসে অভিযোগ করেনি বা নিজ হাতে অভিযোগপত্র দেয়নি। তার চাচা আমার কাছে চিঠিটি দিয়েছেন।’

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ছাত্রীর মায়ের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। বাড়িতে গেলে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে রাজি হয়নি ওই ছাত্রীর মা। তিনি এ বিষয়ে তার দেবর সৌরভ সরকারের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।

এ ব্যাপারে হামলায় নেতৃত্ব দেয়া সৌরভ সরকার বলেন, ‘আমার ভাতিজির সাথে অন্যায় করা হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই। স্থানীয়রা ওই শিক্ষককে মারধর করেছে।’

ছাত্রীর হাতে লেখা বলে দাবি করা চিঠিটি কে লিখেছেন-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার ভাতিজির কথা হয়তো অন্য কেউ লিখে দিয়েছে। তবে কে লিখেছে, আমি জানি না।’

অভিযোগের বিষয়ে কোলা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ইলিয়াস মোল্লা বলেন, ‘আমি শিক্ষক শাহ আলমকে চিনিই না। তার সাথে আমার কখনো কথাও হয়নি। স্কুলের পুকুর লিজের টাকা আমি কেন নিতে চাইব? আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে।’

শিক্ষকের ওপর হামলার আগে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি প্রধান শিক্ষককে জানিয়েছিলাম, এলাকার লোকজন ঝামেলা করতে পারে। এর বেশি কিছু জানি না।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদ বলেন, ‘ইলিয়াস মেম্বার আমার চাচা শ্বশুর। তবে স্কুলের পুকুর লিজের টাকা নিয়ে আমি দায়িত্ব নেয়ার আগে কারো সাথে কোনো বিরোধ হয়েছিল কি না, তা আমার জানা নেই। আমি এই স্কুলে যোগ দেয়ার আগে সহকারী শিক্ষক শাহ আলম ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতেন। সে সময় পুকুর লিজের টাকা নিয়ে কী হয়েছে, তা জানি না।’

শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দেয়া অভিযোগপত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চিঠিটি কে লিখেছে, তা আমি জানি না। তবে ছাত্রীর চাচা সৌরভ সরকার বাইরে থেকে এসে চিঠিটি শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দিয়েছেন।’

স্কুলে ঢোকার পরপরই শিক্ষককে মারধরের ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত কি না-এ প্রশ্নের জবাবে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘আমি অফিসে প্রবেশের পরপরই তারা হামলা করে। কেন এ হামলা চালানো হয়েছে, তা আমি জানি না।’

সুষ্ঠু তদন্ত দাবি
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ সচেতন মহলের অনেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

ঝিনাইদহ সদরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম লিকু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘বর্তমান সমাজব্যবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শিক্ষকরাই যেন এখন সমাজের বড় শত্রু! ব্যক্তিগত, সামাজিক বিরোধ কিংবা বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজে প্রভাব বিস্তার করতে না পারার কারণে শিক্ষকদের হয়রানি ও মানহানি করা হচ্ছে।’

এদিকে শিক্ষককে মারধরের পর শিক্ষার্থীকে দিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ দেয়ার ঘটনায় জেলা পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান বলেন, ‘ছাত্রীর মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত করে এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ছাড়া স্কুলের অফিসে ঢুকে শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনায় কেউ অভিযোগ দিলে তদন্ত সাপেক্ষে সে বিষয়েও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কারণ, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার অধিকার কারো নেই।’