রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’

শিক্ষা, জলবায়ু ও বিনিয়োগে সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান

উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. ফেলিক্স গের্ডেস বলেন, গণতন্ত্র, গবেষণা, নাগরিক শিক্ষা ও শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ফ্রিডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুং বিশ্বব্যাপী কাজ করছে। বাংলাদেশেও ন্যায্য অর্থনৈতিক নীতি, শ্রম ইস্যু এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

আব্দুল আউয়াল, রাজশাহী ব্যুরো

Location :

Rajshahi
ফাইল ছবি

বাংলাদেশের সাথে শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, সংস্কৃতি, জলবায়ু কার্যক্রম, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরো সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে। তিনি বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ ও ফ্রান্স ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে একসাথে কাজ করতে পারে। একইসাথে তিনি বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।

বুধবার (২৯ জুলাই) সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) ও ফ্রিডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুং (এফইএস) বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’ সিরিজের দ্বিতীয় পর্বে প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।

সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এফইএস বাংলাদেশের রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. ফেলিক্স গের্ডেস, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মো: আবদুল আলীম এবং এফইএস বাংলাদেশের প্রোগ্রাম অ্যাডভাইজার সাধন কুমার দাস।

উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. ফেলিক্স গের্ডেস বলেন, গণতন্ত্র, গবেষণা, নাগরিক শিক্ষা ও শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ফ্রিডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুং বিশ্বব্যাপী কাজ করছে। বাংলাদেশেও ন্যায্য অর্থনৈতিক নীতি, শ্রম ইস্যু এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

তিনি বলেন, ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’ কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিদেশী কূটনীতিকদের সাথে বাংলাদেশের মানুষের সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

স্বাগত বক্তব্যে প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মো: আবদুল আলীম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, সঙ্ঘাত, অভিবাসন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অপতথ্যের বিস্তার এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী দক্ষতা, ডিজিটাল সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা জরুরি।

তিনি বলেন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের সহযোগিতা ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে।

মূল বক্তব্যে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার রক্ষা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অন্যতম ভিত্তি।

ফ্রান্সের নারীবাদী পররাষ্ট্রনীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, লিঙ্গ, পরিচয় বা সামাজিক পটভূমি নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর বিকল্প কোনো গ্রহ নেই।’ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে জলবায়ু অভিযোজন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারের বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, সঙ্ঘাত, সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিশ্বজুড়ে নতুন সঙ্কট তৈরি করেছে। এসব সঙ্কট মোকাবেলায় বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা আরো জোরদার করতে হবে।

‘গ্লোবাল সাউথ’ কিংবা ‘কালেক্টিভ ওয়েস্ট’র মতো বিভাজনের পরিবর্তে অভিন্ন স্বার্থ ও সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

আলোচনাপর্বে বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্ক, শিক্ষা, বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সঙ্কট, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল ও বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের জনগণের দৃঢ়তা ও গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা প্রশংসনীয়। তিনি ওষুধ শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি খাতকে দুই দেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশে ফরাসি বিনিয়োগ বাড়াতে উন্মুক্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ, দুর্নীতি দমন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

উচ্চশিক্ষা বিষয়ে তিনি বলেন, ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ দিচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত কোর্সের সংখ্যাও বাড়ছে। উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ দিতে ‘ক্যাম্পাস ফ্রান্স’ কাজ করছে।

রোহিঙ্গা সঙ্কট প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত বাংলাদেশের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখা। তবে সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান নির্ভর করছে মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে এবং নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করতে ফ্রান্স প্রস্তুত রয়েছে।

প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্লু ইকোনমি, মানবাধিকার, বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষা, জাতিসঙ্ঘের ভেটো ব্যবস্থা ও ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতির বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে ব্লু ইকোনমিতে টেকসই বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে বাণিজ্য সহজীকরণ এবং তৈরি পোশাক খাতে কারিগরি বাধা দূর করতে দুই দেশের আরো ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি মুক্তচিন্তা ও জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র। কূটনীতি মূলত মানুষে-মানুষে সম্পর্কের বিষয় এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি, উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও জলবায়ু সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হয়েছে।