বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়নের মধ্য দিয়েই দেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে মন্তব্য করে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন, ‘ওই সংবিধানের অন্যতম কারিগর ড. কামাল হোসেনকে আজ আবার সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে; যা পুরোনো নেতৃত্ব ও পুরোনো বন্দোবস্ত পুনর্বাসনেরই অংশ।’
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) বিকেলে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে রাজশাহী জেলার সাংবাদিকদের নিয়ে পিআইবি আয়োজিত নির্বাচনকালীন সাংবাদিকতা বিষয়ক দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ফারুক ওয়াসিফ বলেন, ‘দেশে কি আর কোনো সংবিধান বিশেষজ্ঞ নেই যে, আবার ড. কামাল হোসেনের কাছেই সংবিধান পড়তে হবে? যে কামাল হোসেন ৭২-এর সংবিধানকে ফ্যাসিবাদ তৈরির আঁতুরঘর বানিয়েছিলেন, তাকেই আজ তথাকথিত সুশীল সমাজ সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে।’
সাংবাদিকতার বর্তমান বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকতা দীর্ঘদিন ধরে অপুষ্ট, অনিরাপদ ও পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ৫৯ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন এবং প্রায় দেড় হাজার সাংবাদিক বিভিন্নভাবে আহত-পঙ্গু হয়েছেন।’
পিআইবি মহাপরিচালক আরো বলেন, ‘১৯৭১ সালের নয় মাসে ১৩ জন সাংবাদিক শহীদ হন, অথচ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শেষ দুই সপ্তাহেই ছয়জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন; যাদের মধ্যে পাঁচজন পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান।’
তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকরা একই সাথে জনগণের পক্ষে এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কারণেই সবচেয়ে বেশি নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। সাংবাদিক দুই শিবিরেই ছিল—জনতার শিবিরেও, ক্ষমতার শিবিরেও। আর সে কারণেই তারা টার্গেট হয়েছে।’
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে ফারুক ওয়াসিফ বলেন, ‘নির্বাচন যে রাতে হয়ে যাবে—এ কথা জানা সত্ত্বেও কিছু সম্পাদক ও গণমাধ্যম একটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করেছিল। সেই ব্যর্থতার ফলেই আজকের রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘এখনো গণমাধ্যমের একটি অংশ অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা ও নির্বাচন নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পুরোনো কৌশল ও পুরোনো নেতৃত্ব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।’
সাংবাদিকদের উদ্দেশে পিআইবি মহাপরিচালক বলেন, ‘শুধু ভোট আয়োজন নয়—সংস্কার হবে কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। প্রার্থীরা সংসদে গিয়ে বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবেন কি না, দলীয় কর্মীদের কী নির্দেশনা দিচ্ছেন—এসব প্রশ্ন করা সাংবাদিকদের দায়িত্ব।’
তিনি বলেন, ‘ভোটারের জানার অধিকার নিশ্চিত না হলে জুলাইয়ের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে।’
ফারুক ওয়াসিফ আরো বলেন, ‘জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তির পদত্যাগের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল একটি ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপের আন্দোলন। এই মাটি শহীদের রক্তে উর্বর হয়েছে। সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো- এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো সন্তানকে রাজপথে প্রাণ দিতে না হয়।’
পিআইবির অধ্যয়ন ও প্রশিক্ষণ বিভাগের প্রশিক্ষক মোহাম্মদ শাহ আলমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার। এতে আরো বক্তব্য রাখেন পিআইবির রিসোর্স পারসন জিয়াউর রহমান ও সুলতান মাহমুদ, বিএফইউজের সহকারী মহাসচিব ড. সাদিকুল ইসলাম স্বপন, রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মুহা: আব্দুল আউয়াল, সাধারণ সম্পাদক ডালিম হোসেন শান্ত, দৈনিক রাজশাহী সংবাদের প্রধান সম্পাদক ডা. নাজিব ওয়াদুদ, রাজশাহী টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শ. ম সাজু প্রমুখ।



