ভরা মৌসুমেও খুলনায় ধরাছোঁয়ার বাইরে ইলিশের দাম

নদীর একটু বড় ইলিশ বছরে এক-দুবার খেতে পারি। কিন্তু সেটাও আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে যায়। সিজনের (মৌসুম) সময়ও যদি এমন দাম থাকে, তাহলে আমরা খাবো কিভাবে?

নয়া দিগন্ত অনলাইন

Location :

Khulna
ইলিশ মাছ
ইলিশ মাছ |সংগৃহীত

মাছের রাজা ইলিশ, স্বাদে এই মাসের তুলনা মেলা ভার। তবে ভরা মৌসুমেও এবার সেভাবে ইলিশের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না খুলনার বাজারে, যা-ও আসছে তার দাম ক্রেতাদের নাাগলের বাইরে। গত বছরের তুলনায় এবার খুলনার বাজারগুলোতে ইলিশের দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে।

ইলিশ ঘাট বলে পরিচিত ভৈরব নদের পাড়ের ৫ নম্বর ঘাট এবং রুপসা মাছ ঘাটে গত দু’দিন সরেজমিনে দেখা গেছে, ইলিশের সরবরাহ নেই বললেই চলে। কেবল কিছু জাটকা ইলিশ এ সময় চোখে পড়ে।

ইলিশ মাছের আড়তদার সাঈদ আলী বলেন, ‘আমার বাবা ও দাদা ইলিশ মাছের আড়তদার ছিলেন। প্রায় ৭০ থেকে ৮০ বছরের ব্যবসা আমাদের। কিন্তু কখনো এ বছরের মতো ইলিশের আকাল পড়েনি। আমরা সাধারণত খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছেই ইলিশ বিক্রি করি, কিন্তু দামের কারণে তারা এখন অন্য মাছের ব্যবসা করছেন।’

খুলনার নিউমার্কেটে কাঁচাবাজারের সামনে থেকে রিকশাচালক জালাল বলেন, ‘ইলিশ এখন শুধু বাজারের দোকানেই সাজানো দেখি, কিন্তু কিনে খাওয়া আর হয় না। দুই বছর আগে ছোট মেয়েটা বায়না ধরেছিল, তখন সাড়ে ৫০০ টাকা দিয়ে চারটা জাটকা ইলিশ কিনেছিলাম। এরপর আর কেনা হয়নি। এখন বাজারে যাই, শুধু দূর থেকে দেখি। যখন অন্যরা বাজার করে ফিরে যায়, তখন তাদের কাছে দাম শুনি, কেনা আর হয়ে ওঠে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘সারা দিন রিকশা চালিয়ে যে কয়টা টাকা হাতে আসে, তা দিয়েই পাঁচজনের সংসার চালাতে হয়। ঘরভাড়া, বাজারঘাট, দুই মেয়ে আর ছেলের খরচ সব মিলিয়ে মাস পার করতে কষ্ট হয়ে যায়। সেখানে ইলিশ মাছ কিনে খাওয়ার মতো বাড়তি পয়সা কই?’

নগরীর নিউমার্কেট ও ময়লাপোতা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ‘এক কেজির উপরে ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ টাকা দরে, কেজির নিচে ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ টাকা দরে এবং ৬০০ থেকে ৭০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ টাকা আর ৪০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

নিউমার্কেটে বাজার করতে আসা মাসুমা লিমা নামে এক নারী বলেন, ‘ভরা মৌসুমেও সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে ইলিশের দাম। তাই সাধ থাকলেও এখনো মুখে তোলা হয়নি মাছটি। মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য হিসেবে সাধ্যের মধ্যে বাজার সামলানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।’

তিনি বলেন, ‘নদীর একটু বড় ইলিশ বছরে এক-দুবার খেতে পারি। কিন্তু সেটাও আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে যায়। সিজনের (মৌসুম) সময়ও যদি এমন দাম থাকে, তাহলে আমরা খাবো কিভাবে? এখন ফেসবুকে ছবি দেখেই স্বাদ মেটাতে হচ্ছে।’

ইলিশের দাম বেশি হওয়ায় বাজারে ক্রেতাদের সাড়া মিলছে না বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

নিউমার্কেটের মাছ ব্যবসায়ী বাদশা মোড়ল বলেন, ‘এখনকার বাজারে মাছের যে দাম তাতে দোকানে মাছ তোলা আমাদের জন্য ভীষণ কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্রেতারা আগের মতো আর আসেন না। সারা দিন বসে থেকেও হাতেগোনা কয়েকটি মাছ বিক্রি হয়। সেই টাকায় মাছ কেনার খরচ, দোকান পর্যন্ত আনা-নেয়ার ভাড়া আর কর্মচারীর বেতন মিটিয়ে কিছুই হাতে থাকে না। অথচ আমাদের সংসার চলে মাছ বিক্রি করে। মৌসুমের সময়টাতেও আগের মতো লাভ হয় না, দু’চারটা মাছ বিক্রি করেও তেমন লাভ থাকে না। এভাবে দিন চালানো কঠিন।’

আরেক মাছ ব্যবসায়ী প্রান্ত বলেন, ‘সারা দিনে পাঁচ-সাতজন ক্রেতা এলেও দুই-একজন দাম শুনে চলে যান। ফলে ইলিশের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। অনেক সময় মাছ দুই থেকে চার দিনের বেশি দোকানে পড়ে থাকে, তখন বাধ্য হয়ে কেনা দামে বা তার চেয়ে কমে বিক্রি করতে হয়। সব মিলিয়ে এখন বাজারে ইলিশের ব্যবসা করা বেশ কষ্টকর।’ সূত্র : ইউএনবি