নির্বাচন ঘিরে উপকূলীয় অঞ্চলে কোস্ট গার্ডের নজরদারি বাড়ছে

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড দেশের উপকূলীয় ও নদী তীরবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ, বনজ সম্পদ সংরক্ষণ, মৎস্যসম্পদ রক্ষা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানবিক সহায়তা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

Location :

Bagerhat
সাংবাদিকদের ব্রিফ করছেন জোনাল কমান্ডার কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম
সাংবাদিকদের ব্রিফ করছেন জোনাল কমান্ডার কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম |বাসস

বাগেরহাটের সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলসমূহে বছরব্যাপী বিভিন্ন অভিযান চালিয়ে অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছে কোস্ট গার্ড বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা টহল জোরদার করেছে কোস্ট গার্ড।

জোনাল কমান্ডার কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম আজ দুপুরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড দেশের উপকূলীয় ও নদী তীরবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ, বনজ সম্পদ সংরক্ষণ, মৎস্যসম্পদ রক্ষা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানবিক সহায়তা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলদস্যু ও বনদস্যু নির্মূল, জেলেদের নিরাপত্তা প্রদান এবং সমুদ্র ও নৌপথে অবৈধ কার্যক্রম প্রতিরোধে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড জনগণের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায়, কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় ও নদী তীরবর্তী অঞ্চল, মোংলা বন্দর ও অন্যান্য কেপিআই সমূহের নিরাপত্তা প্রদানসহ চোরাচালান প্রতিরোধ, বনজ সম্পদ সংরক্ষণ, মৎস্য সম্পদ রক্ষা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানবিক সহায়তা প্রদান করে আসছে।

তিনি জানান, জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সুন্দরবনে ডাকাত ও জলদস্যুবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে মোট ৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, দু’টি হাত বোমা, ৭৪টি দেশীয় অস্ত্র, অস্ত্র তৈরির বিপুল সরঞ্জামাদি, ৪৪৮ রাউন্ড কার্তুজ এবং ডাকাতদের কাছে জিম্মি থাকা ৫২ জন নারী ও পুরুষ উদ্ধার করা হয়। এসব অভিযানে মোট ৪৯ জন ডাকাতকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

একই সময়ে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে পাঁচ হাজার ৬৭৪ পিস ইয়াবা, ১৩ কেজি গাঁজা, এক হাজার ২৫৬ বোতল বিদেশী মদ ও বিয়ারসহ মোট ৫১ জন মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণ অভিযান পরিচালনা করে, ৮২৪ কেজি হরিণের মাংস ও হরিণের বিভিন্ন অঙ্গসহ ছয় শ’টি হরিণের ফাঁদ জব্দ করা হয়। এসব ঘটনায় ২৯ জন হরিণ শিকারিকে আটক করা হয়। এছাড়া ১৪০০ পিসেরও বেশি গেওয়া ও গড়ান কাঠ, দু’টি তক্ষক, ৬২টি বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপ এবং তিন হাজার চার শ’ কেজি পলিথিন জব্দ করা হয়।

অবৈধ মৎস্য আহরণবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে প্রায় এক হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা সমমূল্যের ১২ কোটি মিটারেরও বেশি অবৈধ জাল এবং ১২০ কোটি টাকা সমমূল্যের রেণু পোনা এবং ১৪ হাজার কেজি জেলি পুশকৃত চিংড়ি জব্দ করা হয়।

এছাড়াও উপকূলীয় অঞ্চলে আর্তমানবতার সেবায় কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন চলতি বছরে দুই হাজারের বেশি দুস্থ, অসহায় ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করেছে। কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন পরিবার কল্যাণ সংঘ উপকূলীয় অঞ্চলে পাঁচ শ’র বেশি অসহায়, গরীব ও দুঃস্থ শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছে।

ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম বলেন, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থী, জেলে, মাঝি, পেশাজীবী ও সাধারণ জনগণের উপস্থিতিতে পরিবেশ ও বন রক্ষা, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, দুর্যোগকালীন উদ্ধার কার্যক্রম এবং অগ্নি নির্বাপণ বিষয়ে তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ প্রদানসহ কিশোর-তরুণদের মাঝে দেশপ্রেম জাগ্রতকরণ এবং মাদকবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধিতে নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করেছি। নির্বাচন যেন সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা যায়, সে লক্ষ্যে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের আওতাধীন উপকূলীয় এলাকাসমূহে ইতোমধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে। নির্বাচনে সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য কোস্টগার্ড সদস্যদের নির্বাচন কেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। অত্র অঞ্চলের জনগণের নিরাপত্তা এবং অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করতে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন সর্বদা সজাগ ও প্রস্তুত থাকবে।

অত্র অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সফরকালীন সময়ে কোস্ট গার্ড কর্তৃক নৌপথে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়। সুন্দরবনে আগত পর্যটকদের দুর্ঘটনা রোধে কোস্ট গার্ড, পর্যটকবাহী নৌযানসমূহে লাইফ জ্যাকেটের ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন রোধে নিয়মিত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর ফলে সুন্দরবনে আগত পর্যটকদের নৌপথে নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ, বন বিভাগ, মৎস্য অধিদফতর এবং অন্যান্য মেরিটাইম সংস্থার সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে আসছে। কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন শুধু উপকূলীয় নিরাপত্তা নয়, বরং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনগণের জান-মাল রক্ষা, বন্দর নিরাপত্তা, বনজ সম্পদ সংরক্ষণ এবং মানবিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করেছে এবং ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

সূত্র : বাসস