শহীদ আবু সাঈদ হত্যা

রায়ে তীব্র অসন্তোষ, ২৮ জনের সাজা বাড়াতে আপিল করার দাবি

‘যারা ইন্ধনদাতা, যারা আদেশদাতা তাদেরকে ফাঁসি না দিয়ে দু’জন কনস্টেবলের ওপর দিয়ে এই রায় ঘোষণা করল। এটা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। অবশ্যই পরিবার, আইনজীবী ও রাষ্ট্রের সাহায্য নিয়ে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।’

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর ব্যুরো

Location :

Rangpur
কথা বলছেন শহীদ আবু সাঈদের বাবা-মা
কথা বলছেন শহীদ আবু সাঈদের বাবা-মা |নয়া দিগন্ত

শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তার বাবা-মা, সহপাঠী ও সহযোদ্ধারা। আইনজীবী ও রাষ্ট্রপক্ষের সাথে আলাপ করে ৮ জনের সাজা বাড়াতে আপিল করার কথাও জানিয়েছেন তারা।

রংপুরের পীরগঞ্জের বাবুনপুর গ্রাম। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকাল থেকেই রায়ের জন্য উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের বাবা-মা ও পরিবারের। দুপুরে যখন রায় ঘোষণা করা হয়, তখন অসন্তুষ্ট চিত্তে শহীদ আবু সাঈদের কবরের পাশে আসেন মা মনোয়ারা বেগম ও বাবা মকবুল হোসেন। তার সাথে ছিলেন হত্যা মামলার সাক্ষী ও চাচাতো ভাই রুহুল আমিন। কিছুক্ষণ কবরের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন তারা পরে কথা বলেন সাংবাদিকদের সাথে।

রায়ে তীব্র অসন্তোষ তাদের। আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম কোনোভাবেই মানতে পারছেন না এই রায়। তিনি বলেন, ‘আমার ছইলের (ছেলের) জীবন দিয়া তো কিছুই হইল না। এই বিচারে শান্তি হয় নাই। মোরও (আমারও) শান্তি হইল না। হামার (আমার) ছইলের আত্মাও শান্তি পাবার নয় (পাবে না)। দুনিয়াত সঠিক বিচার নাই।’

মনোয়ারা বেগম আরো বলেন, ‘বিচার সঠিক হয় নাই। আশা করছি প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া এই বিচার সঠিক করবে। দুইটা আসামির ফাঁসি দিছে। আরগুলাক (বাকিগুলোর) ফাঁসি দেয় নাই। ছাত্রলীগের পোমেল বড়ুয়া আমার ছাওয়াক (ছেলেকে) খুব নির্যাতন করছে। কিন্তু তাকে মাত্র দশ বছর কারাদণ্ড দিছে। এটাতে আমি খুবই অসন্তুষ্ট।’

তিনি আরো বলেন, ‘এলাও (এখনো) অনেকগুলো আসামিক ধরে নাই। আবু সাঈদ হত্যার সাথে জড়িত আছলো (ছিল) সেগুলো পালাই (পালিয়ে) গেছে। এখন সরকার হিসেবে তারেক জিয়ার কাছে সঠিক বিচারটা চাওছি (চাইছি)। আরো বড় বড় নেতা, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশের বড় বড় অফিসার, শেখ হাসিনা ভারতে পালায় (পালিয়ে) আছে এবং আরো যারা আমার ছইল (ছেলে) হত্যা করবার হুকুম দেছে (দিছে) তাকেও ধরবার (ধরার) কওছি (বলছি)। হুকুমদাতার ঘরক (হুকুমদাতাদের) ধরা হয় নাই। অনেকে বাইরে আছে, ফির (আবার) শাস্তি কম দেছে। পাঁচ বছর, ১০ বছর, এতে হামরা (আমরা) খুশি নই। হামাক (আমাদের) যেন আপিল করবে দেন (করতে দেয়)।’

Abu-Sayeed-Murder

আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেনের কণ্ঠে ক্ষোভের বারুদ। তিনিও অসন্তুষ্ট। বললেন এই রায় কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। দেশের কোনো মানুষই এই রায় মেনে নেবে না। তিনি বলেন, ‘দু’জনকে ফাঁসি দিয়েছে, তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। এতে আমি সন্তুষ্ট নই।’

তিনি বলেন, ‘আরো লোকের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল। তবে ১ নম্বরে হলো পোমেল বড়ুয়া। উনি কিন্তু সাংঘাতিক দোষী। ছেলেকে বিনা দোষে অপদস্ত করেছে। গলা টিপে ধরেছিল। ছাত্রলীগের লিডার আমার ছেলের গাল ও বুকে থাপড়াইছে। আমার ছেলে রোকেয়া ভার্সিটির সমন্বয়ক হিসেবে বক্তব্য দিয়েছিল। বলেছিল আমি কোনো সরকারবিরোধী আন্দোলনে বক্তব্য দিচ্ছি না। আমি অধিকার আদায়ের জন্য বক্তব্য দিচ্ছি। যার কারণে এসে গলা টিপে ধরেছিল এই পোমেল বড়ুয়া। তার ফাঁসির রায় হলো না। আর মাত্র দু’জনের ফাঁসি, এটায় সন্তুষ্ট নই আমরা। আরো বেশি লোকের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল। এই রায়ে আমি সন্তুষ্ট হতে পারলাম না।’

তিনি আরো বলেন, ‘যারা অপরাধী তারাই পালায় গেছে। এই যে পালালো আসাদ মন্ডল। যদিও নাম বলা ঠিক না। আমার ছেলেক মারার জন্য উনি জড়িত ছিল, সেই জন্য বললাম। এইরকম যারা অপরাধী তারা অনেকে এড়িয়ে গেছে। পুলিশের বড় কর্মকর্তা তাদেরকে কোনো সাজা দেয়া হয়নি। শুধু কনস্টেবল এর ওপর দিয়ে গেল।’

মকবুল হোসেন বলেন, ‘যাদের আদেশে আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে তারাই বাঁচি (বেঁচে) গেল। বড় বড় অপরাধীরা বাঁচি গেছে। আজকের রায়ে অসন্তুষ্ট। আইনজীবী ও ছেলেদের সাথে পরামর্শ করে, রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে পরামর্শ করে কী করা যাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার সাক্ষী ও তার চাচাত ভাই রুহুল আমিন বলেন, ‘যারা উচ্চ পদস্ত কর্মকর্তা রয়েছেন তারাই গুলি করা এবং লাঠিচার্জ করার আদেশটা করেন। সেক্ষেত্রে যারা ইন্ধনদাতা, যারা আদেশদাতা তাদেরকে ফাঁসি না দিয়ে দু’জন কনস্টেবলের ওপর দিয়ে এই রায় ঘোষণা করল। এটা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। অবশ্যই পরিবার, আইনজীবী ও রাষ্ট্রের সাহায্য নিয়ে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘যাদেরকে যাবজ্জীবন দেয়া হয়েছে তাদের ফাঁসির দেয়া উচিত ছিল। যারা এই হত্যাকাণ্ডের ইন্ধনদাতা ছিল তাদের এত কম শাস্তি দিয়ে রায় দিয়েছে এটা খুবই দুঃখজনক। এ ধরনের একটা মামলার রায় যদি শুধু দু’জনের ওপর দিয়ে পার পায়, তাহলে এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা আশা করছি, এই রায়ের যদি আপিল করে সাজা বাড়ানো যায় তাহলে অন্তত পরিবার থেকে সবাই খুশি থাকবে। অনেক আসামি আবার পলাতক রয়েছে তাদের ধরার কোনো পদক্ষেপ নাই।’

রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আবু সাঈদের সাথে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেয়া সমন্বয়করাও।

শহীদ আবু সাঈদের সাথে আন্দোলনে যোগ দেয়া সমন্বয়ক বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শামসুর রহমান সুমন বলেন, ‘আমরা হতাশ হয়েছি। দীর্ঘ দুই বছর পর এই রায় দেয়া হলো। আমরা চেয়েছিলাম অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এই রায় দেয়া হোক। কিন্তু সেটা দেয়া হয়নি; বরং যে রায় দেয়া হয়েছে তাতে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। মনে হচ্ছে যেন অভিযুক্তদেরকে দায় মুক্তি দেয়া হচ্ছে। এই রায় আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। অবিলম্বে রায় রিভিউয়ের বন্দোবস্ত করার জন্য রাষ্ট্রপক্ষকে আহ্বান জানাচ্ছি।’

জাতীয় যুব শক্তির কেন্দ্রীয় সংগঠক মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘এই রায়ের মাধ্যমে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়নি। এই রায়টির দিকেই তাকিয়ে ছিল দেশ ও বিদেশের সর্বস্তরের মানুষ। কিন্তু খুবই হালকাভাবে দেয়া হলো এই রায়। এর মাধ্যমে পরবর্তী মামলাগুলোর ওপর এই রায়ের প্রভাব পড়বে। আমরা আশা করি সরকারপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন। খুবই দ্রুত রায় রিভিউ করার আবেদন করবেন।’

তবে রায় নিয়ে অসন্তুষ্ট হলেও রায় হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. এম শওকত আলী। তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্ব দেখেছে কিভাবে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আবু সাঈদের এই হত্যাকাণ্ড জুলাই বিপ্লবের একটি অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। কিন্তু যে রায় প্রদান করা হয়েছে তাতে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হয়েছে বলে আমরা মনে করি। তবে দীর্ঘদিন পরে হলেও যে রায়টি দেয়া হয়েছে তাতে আমি সন্তুষ্ট। কারণ এই রায় দেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই আমি বিভিন্নভাবে কথা বলেছি। পরিবার, রাষ্ট্রপক্ষ ও সমন্বয়করা মিলে রায়ের ব্যাপারে আপিল করা হবে কি-না সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’