ভূমধ্যসাগরে আরো এক তরুণের মৃত্যু

সুনামগঞ্জের ১৩ তরুণের প্রাণহানিতে গ্রামে গ্রামে মাতম

নিহত মহিবুর রহমানের বাড়ি ছাতক উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের ঘাগলাজুর গ্রামে। তার বাবা মো. নুরুল আমিন ও মা মহিমা বেগম। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মহিবুর ছিলেন সবার বড়। তিনি দেশে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন এবং তার আয়েই চলত পুরো পরিবার।

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sunamganj
নিহত মহিবুর রহমান
নিহত মহিবুর রহমান |নয়া দিগন্ত

ভূমধ্যসাগরে লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার পথে সুনামগঞ্জের আরো এক তরুণের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহত ওই তরুণের নাম মহিবুর রহমান (২০)। তিনি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের ঘাগলাজুর গ্রামের বাসিন্দা। এ নিয়ে একই নৌকায় সুনামগঞ্জ জেলার মোট ১৩ তরুণের মৃত্যু হয়েছে।

জানা গেছে, গত ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা একটি রাবারের বোটে ছিলেন মহিবুর রহমান। ওই নৌকাতেই এর আগে সুনামগঞ্জের আরো ১২ তরুণের মৃত্যু হয়। দীর্ঘ সময় সাগরে পথ হারিয়ে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটে অনাহারে দুর্বল হয়ে পড়েন যাত্রীরা। একপর্যায়ে মহিবুর রহমানও মৃত্যুবরণ করেন।

নিহত মহিবুর রহমানের বাড়ি ছাতক উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের ঘাগলাজুর গ্রামে। তার বাবা মো. নুরুল আমিন ও মা মহিমা বেগম। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মহিবুর ছিলেন সবার বড়। তিনি দেশে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন এবং তার আয়েই চলত পুরো পরিবার।

বুধবার (১ এপ্রিল) নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের মৃত্যুর খবরে মা মহিমা বেগম শোকে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন। বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি। ছোট ভাই হাফিজুর রহমানও অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে তাকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পরিবারের অন্য সদস্যরাও শোকে ভেঙে পড়েছেন।

নিহতের বাবা নুরুল আমিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেটারে না খাওয়াইয়া মারছে। দালালরা আগে টাকার জন্য মারধর করেছে। পরে ছেলে আমাকে মেসেজ দিয়ে দেশে নিতে বলেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত না খেয়ে মারা গেল।”

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মহিবুর রহমান চার মাস আগে গ্রিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন। সৌদি আরব হয়ে লিবিয়ায় যান তিনি। সেখানে চরম কষ্টে আছেন বলে পরিবারকে জানিয়েছিলেন এবং দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধও করেছিলেন। ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে পরিবারের জমি বিক্রি ও সুদে ঋণ নিয়ে প্রায় ১৩ লাখ টাকা দালালদের দেয়া হয়।

নিহতের চাচাতো ভাই ও ভাতগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ সুনু মিয়া জানান, পরিবারটি অত্যন্ত দরিদ্র। জমি বিক্রি ও ঋণ নিয়ে মহিবুরকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। এই ঘটনায় পরিবারটি এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা এলাকার নবী হোসেনের মাধ্যমে মহিবুর রহমান গ্রিসে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। দেশে নবী হোসেনের বাবা আবদুল মন্নান পুরো লেনদেন সম্পন্ন করেন।

ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানতে পেরে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ফাঁড়িকে খোঁজ নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এর আগে গত শনিবার ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ১২ তরুণের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়। তাদের মধ্যে দিরাই উপজেলার ছয়জন, জগন্নাথপুর উপজেলার পাঁচজন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার একজন ছিলেন। পরে ছাতক উপজেলার মহিবুর রহমানের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩ জনে।

জানা গেছে, ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে রওনা দেওয়া বোটটি ছয় দিন সাগরে পথ হারিয়ে ভাসতে থাকে। জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় খাবার ও পানির সঙ্কট দেখা দেয়। অনাহারে দুর্বল হয়ে একে একে ২২ জন মারা যান। দুর্গন্ধ ছড়ালে দালালদের নির্দেশে মরদেহগুলো সাগরে ফেলে দেয়া হয়। ২৭ মার্চ গ্রিস উপকূলে পৌঁছানোর পর জীবিতদের উদ্ধার করা হলে এ ঘটনা প্রকাশ পায়।

এ ঘটনায় ইতোমধ্যে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর ও দিরাই থানায় নয় দালালের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের হয়েছে। মামলার আসামিদের মধ্যে কয়েকজন লিবিয়া, গ্রিস ও ইতালিতে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

ভূমধ্যসাগরে এই ঘটনায় সুনামগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে চলছে শোকের মাতম।