উপকূলীয় জেলা বরগুনা উন্নয়নের দিক থকে পিছিয়ে পড়া জনপদ। বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী বরগুনা জেলার বিষখালী নদীর অব্যাহত ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বামনা উপজেলায় বিষখালী নদীর তীব্র ভাঙনে হুমকির মুখে পড়েছে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং হাজারো মানুষের বসতভিটা।
উপজেলার একমাত্র সরকারি খাদ্যগুদামটি বিষখালী নদীর তীরে অবস্থিত, যেখানে দুই থেকে তিন হাজার টন খাদ্যশস্য মজুদ থাকে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে গুদামটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা সরকারের কোটি টাকার ক্ষতির কারণ হতে পারে এবং খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থায় মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। খাদ্যগুদামের পাশেই সরকারের নির্মিত ভূমিহীনদের আবাসন প্রকল্পের শতাধিক পরিবার বসবাস করছে। নদীভাঙনের ফলে এসব পরিবারও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
নদী তীরবর্তী গ্রামের শতাধিক মানুষের দিন কাটছে ভাঙন আতঙ্কে। চেঁচান, কলাগাছিয়া সংলগ্ন পূর্ব সফিপুর এলাকায় প্রায় সাত হাজার ৩৬৫ মানুষের বসবাস। একইসাথে বেগম ফায়জুন্নেসা মহিলা ডিগ্রি কলেজ, বামনা সদর আর রশিদ ফাযিল মাদরাসা, ১২ নম্বর বামনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাটসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভাঙনের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
অন্যদিকে, ৩ নম্বর রামনা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে শত শত বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বহু পরিবার সহায়-সম্বল হারিয়ে সর্বশান্ত হয়ে পড়েছে এবং মানবেতর জীবনযাপন করছে।
এদিকে বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরু না হলেও বিষখালী নদীর ভাঙন পরিস্থিতি ইতোমধ্যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিনই বসতঘর, ফসলি জমি, সড়ক ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নদীতে বিলীন হচ্ছে। ফলে হাজারো মানুষ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ২২টি পোল্ডারে মোট ৮০৫ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় দুই কিলোমিটার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে কিছু এলাকায় টেকসই বাঁধ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বামনা লঞ্চঘাট, কলগাছিয়া খাদ্যগুদাম, আবাসন থেকে দক্ষিণ রামনা ও চলাভাংঙ্গা এলাকা। ইতোমধ্যেই বাঁধের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। অবশিষ্ট অংশও মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত প্রতিরক্ষা বা টেকসই বাঁধ নির্মাণের ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো নদীগর্ভে বিলীন ও বিস্তীর্ণ কৃষি জমিতে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রুহিতা গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা বিএনপি সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সালাহ উদ্দিন হাওলাদার বলেন, ‘প্রতিবছর আমাদের জমি ও ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হচ্ছে। গত বছর পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেলা জিও ব্যাগ ছয় মাসও টেকেনি, নদীর প্রবল স্রোতে সব নদীগর্ভে ভেসে গেছে, এ যাবত টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি।’
উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সদস্য ও বিশিষ্ট শিল্পপতি রুহুল আমিন শরিফ বলেন, ‘নদীভাঙন এখন উপকূলবাসীর নিত্যদিনের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। স্থায়ী সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়।’
ভাঙ্গন কবলিত এলাকার জনগণের জানমাল নিরাপত্তার স্বার্থে ভাঙ্গন রোধে কাজ করার জন্য জাতীয় সংসদের চীপ হুইপ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মণি ইতোমধ্যেই পানি উন্নয়ন বোর্ড মন্ত্রনালয়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণসহ সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
বামনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিকাত আরা বলেন, ‘আমি কয়েক দফায় বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে এ ব্যাপারে ফোনে যোগাযোগ করেছি। যেহেতু বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বেড়েছে তার সাথে তীব্র স্রোতে ভাঙন শুরু হয়েছে, তাই পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পুনরায় বিষয়টি অবহিত করা হবে।’
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আবদুল হান্নান প্রধান বলেন, ‘দক্ষিণ রামনার ভাঙন এলাকায় জিও ব্যাগ দিয়ে ডাম্পিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে, নতুন প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, অর্থ বরাদ্দ পেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।’
তবে স্থায়ী ব্লক স্থাপনের বিষয়টি সময়সাপেক্ষ বলেও জানান তিনি।



