‘একটা পরিবারের বুক এভাবে খালি করে দেয় যারা, এরা কি মানুষ, না জানোয়ার?’— এমন প্রশ্ন করেছেন জুলাই অভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার কৃষক শহীদ সাইফুল ইসলামের (৩৫) স্ত্রী রহিমা।
স্বামীকে হারানোর সেই দিনের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন রহিমা। তিনি বলেন, ‘উনি তো ধান বেচতে (বিক্রি করতে) গেছিলেন। কেন তাকে গুলি করে মারলো? উনি বেঁচে থাকতেই কষ্ট করে হলেও সংসার চলত। এখন তিনটা ছোট ছোট সন্তান নিয়ে আমি বাঁচব কিভাবে?’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে ২০২৪ সালের ২০ জুলাই দুপুর, একটি বুলেট আর কিছু তাজা রক্ত; মুহূর্তেই ভেঙে দিয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, তিনটি শিশুর ভবিষ্যৎ আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের শেষ আশ্রয়। মেয়ের আবদার পূরণ করতে আম কিনতে গিয়ে আর ঘরে ফেরা হয়নি কৃষক সাইফুল ইসলামের। সেই দিনের রক্তাক্ত স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় তার স্ত্রী রহিমা, সন্তান ও স্বজনদের।
ঘটনার দিন দুপুরে সাইফুল ইসলাম ছোট ভাইকে সাথে নিয়ে ধান বিক্রি করতে ফুলপুর বাজারে যান। পরিবারের অভাব-অনটনের মাঝেও মেয়ের জন্য আম কিনে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তার। ৭৮ মণ পাঁচ কেজি ধান বিক্রির পর ফলের দোকানের দিকে এগিয়ে যান সাইফুল। কিন্তু কয়েক গজ এগোতেই শুরু হয় গুলির শব্দ। মুহূর্তেই বাজারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। ছোট ভাই শহিদুল ছুটে গিয়ে দেখেন, রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে আছেন বড় ভাই সাইফুল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি গুলি তার বাম চোখের ভ্রু ভেদ করে ডান কানের নিচ দিয়ে বেরিয়ে যায়। দ্রুত তাকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলেও পথেই তার মৃত্যু হয়।
সাইফুলের বড় মেয়ে মিম দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছেলে রামিম এখনো ছোট। সবচেয়ে ছোট মেয়ে সায়মা প্রায় প্রতিদিনই বাবাকে খোঁজে। রাতে ঘুম ভেঙে মাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আম্মা, আব্বা কই? কবে আইবো?’ এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেন না রহিমা। চোখের জলই যেন তার একমাত্র ভাষা।
স্বজনদের ভাষ্য, সাইফুল ছিলেন পরিবারের একমাত্র ভরসা ও কর্মক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুতে শুধু স্ত্রী-সন্তানই নয়; ভেঙে পড়েছেন বৃদ্ধ বাবা তৈয়ব আলীও। ছেলের মৃত্যুর পর তিনি প্রায় নির্বাক হয়ে পড়েছেন। ঘর থেকে বের হন না, মানুষের সাথেও তেমন কথা বলেন না।
আরো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে সাইফুলের মৃত্যুর পর। নাতির লাশ দেখে শোকে জ্ঞান হারান দাদা আফতাব উদ্দিন। তিন দিনের মাথায় তিনিও মারা যান। অল্প সময়ের ব্যবধানে ছেলে ও বাবার লাশ দাফন করতে হয়েছে তৈয়ব আলীকে।
আজও সেই পরিবারের জীবন থমকে আছে। শহীদ সাইফুলের স্ত্রী রহিমা বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে একদিনও বাচ্চাদের ভালো কিছু খাওয়াতে পারিনি। অনেক দিন শুধু ডাল-ভাতেই চলছে।’
ছোট ভাই শহিদুলের প্রশ্নও আজও উত্তরহীন। তার ভাষায়, ‘শুনেছি পুলিশ নাকি হাঁটুর নিচে গুলি করে। তাহলে মাথায় গুলি করলো কেন?’
দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সাইফুলের পরিবারের চোখে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা এখনো অমলিন। তাদের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং পরিবারটির পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হোক।
রহিমার শেষ প্রশ্নটি যেন শুধু তার নিজের নয়; বরং অসংখ্য স্বজনহারা পরিবারের আর্তনাদ—‘একটা পরিবারের বুক এভাবে খালি করে দেয় যারা, এরা কি মানুষ, না জানোয়ার?’



