রাজবাড়ীতে চলতি মৌসুমে হালি পিঁয়াজের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং পাইকারি বাজারে দাম কমে যাওয়ায় প্রতি মণ পিঁয়াজে লোকসান হচ্ছে, যা কৃষকদের হতাশ করছে।
কৃষি গবেষণার এক তথ্যে জানা যায়, পিঁয়াজ উৎপাদনে দেশের মধ্যে রাজবাড়ী জেলা তৃতীয় স্থানে অবস্থানে করছে। দেশে মোট উৎপাদিত পিঁয়াজের ১৪ শতাংশ পিঁয়াজ এ জেলায় উৎপাদন হয়ে থাকে। এ বছর হালি পিঁয়াজ উৎপাদনে সার, বীজ, কীটনাশক, জমি চাষ, সেচ ও দিনমজুরসহ বিঘা প্রতি খরচ হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। বিঘা প্রতি ৮০ থেকে ৯০ মণ পিয়াঁজ উৎপাদন হয়েছে। পিঁয়াজের মান অনুযায়ী প্রতিমণের পাইকারী বাজার দর সাত থেকে ৮০০ টাকা। সেই হিসেবে পিঁয়াজ বিক্রি করে কৃষকরা উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না। যার ফলে চাষিদের লোকসান গুণতে হচ্ছে।
রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে জানা যায়, চলতি মৌসুমে এ জেলার পাঁচটি উপজেলায় ৩৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে পিঁয়াজ চাষ করা হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে চার হাজার আট হেক্টর বেশী। এ মৌসুমে প্রায় চার লক্ষ টন পিয়াজ উৎপাদন হতে পারে। তবে চলতি সপ্তাহের বৃষ্টিতে রাজবাড়ী সদর উপজেলায় প্রায় ১৩৮ হেক্টর জমির পিঁয়াজ তলিয়ে নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া ৪০ থেকে ৫০ হেক্টর পিঁয়াজের জমি আংশিক তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে সদর উপজেলার বাগমারা ও চন্দনী উপজেলায় ৭০ থেকে ৮০ হেক্টর পিঁয়াজের জমি বৃষ্টিতে তলিয়ে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গোয়ালন্দ পৌরসভা ১ নম্বর ওয়ার্ড ওলিমদ্দিন পাড়ার পিঁয়াজ চাষি শামসুল হক বলেন, ‘আমি এক বিঘা জমিতে হালি পিঁয়াজের আবাদ করেছিলাম। সার, কীটনাশক, সেচ, চাষ, লেবার ও পরিবহনসহ মোট ৫৮ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। ফলন ভালো হওয়ায় প্রায় ৮০ মণ পিঁয়াজ উৎপাদন হবে। কিন্তু বর্তমানে বাজার দর খুবই কম। মণপ্রতি সাত থেকে ৮০০ টাকা বিক্রি হওয়ায় লোকসানে পড়তে হচ্ছে। দোকান বকেয়া ও লেবার পরিবহনের টাকা পরিশোধ করতে দাম কম হলেও বিক্রি করতেই হবে।’
পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের পিঁয়াজ চাষি ছলেমান মন্ডল, দবির শেখ, কালু শেখসহ অসংখ্য কৃষক বলেন, এ বছর শুরু থেকেই হালি পিঁয়াজের দাম কম। প্রতিমণের দাম মাত্র ছয় থেকে ৭০০ টাকা। রাখি করে (মওজুদ) বিক্রি করার কথা ভাবছি। কিন্তু সার ওষুধের বকেয়া টাকা ও লেবারের টাকা পরিশোধ করতেই সব পিঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে।
পিঁয়াজ চাষি কবির শেখ বলেন, ‘সরকার আমাদের সহজ শর্তে কৃষি ঋণ দিয়ে এবং বাইরের দেশ থেকে পিঁয়াজ আমদানি বন্ধ করলে সাধারণ চাষিরা পিঁয়াজের ভালো দাম পেতে পারতো।’
রাজবাড়ী সদর উপজেলার বাগমারা ও চন্দনী ইউনিয়নের আ: মালেক ও ছগির মীর বলেন, প্রতি বছর হালি পিঁয়াজ রাখি করে (মওজুদ) রেখে আগামী বছর উৎপাদনের বীজ হিসাবে বিক্রি করি ও নিজে ব্যবহার করি। এ বছর বৃষ্টিতে সব পিঁয়াজের জমি তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।
এ ছাড়া গোয়ালন্দ, বালিয়াকান্দি, কালুখালী ও পাংশা উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে কৃষকদের সাথে আলাপ কালে তারা ক্ষোভের সাথে বলেন, কৃষকদের দুর্বলতার সুযোগে দেশের ব্যবসায়ী মহল সিন্ডিকেট তৈরী করে কৃষকরা যখন যে ফসল উৎপাদন করে তা কমদামে কিনে নিয়ে মওজুদ করে রাখে। এরপর মৌসুম শেষে তা চড়া দামে বিক্রি করে। সংশ্লিষ্টদের কেউ এদিকে নজর দেয় না। কিন্তু উৎপাদনের মৌসুম শুরুতে কৃষকরা সার, বীজ, কীটনাশক সেচের তেলসহ অন্য উপকরনাদি চড়া দামে কিনতে বাধ্য হয়। আমরা কিছু বলতে পারি না। দেশে ব্যবসায়ী, চাকুরীজিবি, ডাক্তার, শিক্ষক সবাই আন্দোলন সংগ্রাম করে তাদের বেতন বাড়ায়। কিন্তু কৃষকদের কোনো আন্দোলন সংগ্রাম নাই, সিন্ডিকেটও নেই। পেটের দায়ে আমাদের ফসলের দাম কম বেশী যাই হোক আবাদ করতেই হয়। এ বিষয়ে কৃষকদের প্রতি সরকারের সুদৃষ্টি থাকা প্রয়োজন। সরকারের সঠিক নজরদারি থাকলে এমনটা হতো না।
রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. মো: শহিদুল ইসলাম জানান, চলতি বছর এ জেলার পাঁচটি উপজেলায় ৩৪ হাজার আট হেক্টর জমি মুড়িকাটা পিঁয়াজের চাষ হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার অপেক্ষা চার হাজার ৮০০ হেক্টর বেশী। এসব জমিতে প্রায় চার লাখ টন হালি পিঁয়াজ উৎপাদন হতে পারে। এর বেশির ভাগই উৎপাদন হয় গোয়ালন্দ ও বালিয়াকান্দি উপজেলায়। তবে হঠাৎ অসময়ে বৃষ্টিতে রাজবাড়ী সদর উপজেলার বাগমারা ও চন্দনী এলাকায় প্রায় ১৩৮ হেক্টর পিঁয়াজের জমি তলিয়ে কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে। হালি পিঁয়াজের বাম্পার ফলন হলেও উৎপাদন খরচের তুলনার বাজার দর অনেকটা কম। এতে কৃষকরা হতাশ।



