উপহাসের সেই গোবরই রোকসানার ঘুরে দাঁড়াবার ঠিকানা

দীর্ঘদিন ধরে তিনি গ্রামীণ নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা, বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব কৃষির প্রসারে কাজ করে যাচ্ছেন।

Location :

Raipur
ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের প্রদর্শনী
ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের প্রদর্শনী |নয়া দিগন্ত

রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা
একসময় গোবর নিয়ে কাজ করায় গ্রামের মানুষের কৌতূহল, উপহাস আর নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল রোকসানা আক্তার রেহানাকে। কেউ কেউ অবাক হয়ে জানতে চাইতেন, গোবর দিয়ে আবার কী হবে! সেই গোবর থেকেই আজ উৎপাদিত হচ্ছে মানসম্মত জৈব সার, যা স্থানীয় কৃষকদের কাছে আস্থার প্রতীক। আর সেই পথচলাকে কেন্দ্র করেই বদলাতে শুরু করেছে অনেক গ্রামীণ নারীর জীবন।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার ১ নম্বর উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ঝাউডগী গ্রামের বাসিন্দা রোকসানা আক্তার রেহানা। গৃহিণীর পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি এখন নারী উদ্যোক্তা, সমাজকর্মী ও নিরাপদ কৃষি চর্চার একজন সক্রিয় কর্মী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি গ্রামীণ নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা, বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব কৃষির প্রসারে কাজ করে যাচ্ছেন।

রায়পুর সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা রোকসানা ছোটবেলা থেকেই দায়িত্বশীল ও কর্মঠ ছিলেন। সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমাজের জন্য কিছু করার ইচ্ছাই তাকে উদ্যোক্তার পথে নিয়ে আসে। নিজ বাড়িতে পরীক্ষামূলকভাবে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদনের মাধ্যমে তার যাত্রা শুরু। রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে জৈব সার ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে গিয়ে শুরুতে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। অনেকেই তার উদ্যোগকে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু সময়ের সাথে বদলেছে সেই দৃষ্টিভঙ্গি। এখন তার উৎপাদিত জৈব সার স্থানীয় কৃষকদের কাছে সমাদৃত।

নিজের উদ্যোগকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখেননি রোকসানা। গ্রামের নারীদের নিয়ে কৃষক দল গঠন করেছেন। উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদফতরের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের সাথে নারীদের সম্পৃক্ত করে কৃষি, সেলাই, কুটির শিল্পসহ বিভিন্ন উপার্জন বাড়ানোর কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে উৎসাহিত করছেন। তার উদ্যোগে অনেক নারী নিজের আয়ের পথ তৈরি করেন। এ ছাড়া বাড়ির আঙিনা ও পতিত জমিতে বিষমুক্ত সবজি চাষে নারীদের উদ্বুদ্ধ করছেন তিনি। এতে একদিকে পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত উৎপাদিত সবজি বিক্রি করে বাড়ছে পারিবারিক আয়। পাশাপাশি রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করে নিরাপদ কৃষি ব্যবস্থার প্রসারে ভূমিকা রাখছেন।

নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের সহযোগিতায় ৩০ সদস্যের একটি নারী দল গঠন করেছেন রোকসানা। প্রকল্পের আওতায় সদস্যদের ছাগল পালন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং ছাগল পালনের জন্য শেড নির্মাণে সহায়তা করা হয়েছে। এতে অংশ নেয়া নারীরা প্রাণিসম্পদ পালনের মাধ্যমে বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন।

রোকসানা আক্তার রেহানা বলেন, ‘শুরুতে অনেকে বুঝতে পারতেন না আমি কী করছি। গোবর নিয়ে কাজ করায় হাসাহাসিও করেছেন। কিন্তু এখন মানুষ নিজেরাই জৈব সারের উপকারিতা বুঝতে পারছেন। অনেকেই এই সার ক্রয় করে ব্যবহার করছেন, আবার উৎপাদনেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাজেদুল ইসলাম এবং উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর শরীফ স্যারের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা আমাকে এগিয়ে যেতে সাহস দিয়েছে। আমার প্রত্যাশা, মানুষ নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে আরো সচেতন হবে এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চা বিস্তৃত হবে।’

রোকসানার এই পথচলা শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি গ্রামীণ নারীর আত্মবিশ্বাস, কর্মসংস্থান, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থার এক নীরব পরিবর্তনের গল্প। যে পরিবর্তনের বীজ একদিন বোনা হয়েছিল গোবরের স্তূপে, তার সুফল আজ ছড়িয়ে পড়ছে রায়পুরের জনপদজুড়ে।