জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছিলেন পোশাককর্মী মোশারফ হোসেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি উদ্যোগে তাকে থাইল্যান্ড পাঠানো হলেও চিকিৎসা সম্পন্ন হওয়ার আগেই দেশে ফিরিয়ে আনার অভিযোগ উঠেছে। ফলে পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আশা আজও অধরাই রয়ে গেছে। একদিকে অসম্পূর্ণ চিকিৎসা, অন্যদিকে দারিদ্র্য, ভাড়া বাসার অনিশ্চিত জীবন আর মাথা গোঁজার স্থায়ী কোনো আশ্রয় না থাকায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর দিন কাটছে এই জুলাই যোদ্ধার।
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার শালিহর ছায়ানীড় আবাসন প্রকল্পের ৭ নম্বর ব্যারাকের ৬৫ নম্বর কক্ষে এখন বাবা-মায়ের বসবাস। মোশারফের বাবা মো: নাজিম উদ্দিন ওই আবাসনের মসজিদের মুয়াজ্জিন। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তৃতীয় মোশারফের পরিবারের নিজস্ব কোনো ভিটেমাটি নেই। উপজেলার পশ্চিম শালিহরেই ছিল তাদের পূর্বপুরুষের বসতভিটা, যা এখন শুধুই স্মৃতি।
শুক্রবার কথা হয় মোশারফ হোসেনের সাথে। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে তার। তিনি বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে ছিলাম। তখন মনে হয়েছিল, হয়তো আর বাঁচব না। জীবনের সব সঞ্চয় চিকিৎসার পেছনে শেষ হয়ে গেছে। পরে সরকার আমাকে থাইল্যান্ডে চিকিৎসার জন্য পাঠায়। চিকিৎসক বলেছিলেন, আমি এখনো পুরোপুরি সুস্থ নই, আরো কিছুদিন চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু চিকিৎসা শেষ হওয়ার আগেই আমাকে দেশে ফিরিয়ে দেয়া হয়। থাইল্যান্ডের বিমানবন্দরে আমি সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় ছিলাম। আমার ফ্লাইট ছিল তিন দিন পর। শেষ মুহূর্তে এক প্রবাসী বাঙালির সহায়তায় টিকিট পরিবর্তন করে দেশে ফিরতে পেরেছি।’
সরকারের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেও আক্ষেপ লুকাননি মোশারফ। তিনি বলেন, ‘আর কয়েকটা দিন চিকিৎসা চললে হয়তো পঙ্গুত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতাম।’
বর্তমানে তিনি সরকারি সহায়তা হিসেবে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা পান। তবে সেই অর্থে সংসার, বাসাভাড়া ও নিয়মিত ওষুধের ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গাজীপুরে ভাড়া বাসায় স্ত্রী ও এক মেয়েকে নিয়ে থাকেন তিনি। অন্য মেয়েটি রয়েছে নানাবাড়িতে।
মোশারফ বলেন, ‘আমার নিজের কোনো ঘর নেই। গৌরীপুরে একটি ঘরের জন্য আবেদন করেছি। ঘরটি পেলে অন্তত ভাড়া বাসার বোঝা থেকে মুক্তি পেতাম। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে নিজের এলাকায় থাকতে পারতাম।’
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পোশাকশ্রমিকদের মিছিলে অংশ নেয়ার সময় দুই পায়ে গুলিবিদ্ধ হন মোশারফ। পরে তাকে উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
মোশারফের স্ত্রী রহিমা খাতুন জানান, স্বামীর চিকিৎসার জন্য নিজের সঞ্চয়, বাবার একটি গাভি বিক্রি করে পাওয়া ৮০ হাজার টাকাসহ প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এরপরও ধার-দেনার বোঝা এখনো কাটেনি। ২০২৫ সালের ১৪ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে থাইল্যান্ডে পাঠানো হলেও চিকিৎসা সম্পন্ন হওয়ার আগেই দেশে ফিরিয়ে আনা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গৌরীপুর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক নুর মোহাম্মদ সিদ্দিকী রাজন বলেন, ‘মোশারফ হোসেনের পরিবার অত্যন্ত অসহায়। তিনি দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন। সরকার তার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
রাজপথে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুকে জয় করা মোশারফ হোসেনের লড়াই শেষ হয়নি। এখন তার সংগ্রাম অসম্পূর্ণ চিকিৎসা, দারিদ্র্য ও একটি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। রাষ্ট্রের জন্য জীবন বাজি রাখা এই জুলাই যোদ্ধার পুনর্বাসন ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নিশ্চিত হবে কি না—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অধরাই রয়ে গেছে।



