চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার ভেল্লাপাড়া ক্রসিং এলাকায় একটি অনটেস্ট সিএনজি চালকের কাছ থেকে মামলার ভয় দেখিয়ে ২ হাজার টাকা নেয়া এবং গাড়ি ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ক্রসিং হাইওয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, টাকা নিয়ে গাড়ি ছেড়ে দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পর সংবাদকর্মীদের উপস্থিতিতে ওই গাড়ির বিরুদ্ধে ২ হাজার ৫০০ টাকার মামলা করা হয়। এ বিষয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনাটি বুধবার (১৯ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন সিএনজি চালক মো: হাসান।
তার দাবি, ২০০ টাকার একটি ভাড়া শেষে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় ভেল্লাপাড়া ক্রসিং এলাকায় হাইওয়ে পুলিশ তার সিএনজি আটক করে। পরে তাকে মামলার ভয় দেখিয়ে ক্রসিং হাইওয়ে পুলিশ স্টেশনে পাঠানো হয়।
চালক হাসানের অভিযোগ, সেখানে কনস্টেবল মো: রবিউল ২ হাজার টাকা দেয়ার কথা বলেন। পরে একজন দালালের মাধ্যমে তার কাছ থেকে ২ হাজার টাকা নেয়ার পর গাড়িটি ছেড়ে দেয়া হয়।
হাসান বলেন, ‘আজ সারাদিনে আমার আয় ছিল মাত্র ২০০ টাকা। আগামীকাল কিস্তি দেওয়ার কথা। বাড়ি থেকে কিস্তির টাকা এনে ২ হাজার টাকা দিয়ে গাড়ি ছাড়িয়ে এনেছি। এখন কিস্তির টাকা কীভাবে দেবো?’
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় সাব-ইন্সপেক্টর মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে দায়িত্বে ছিলেন নায়েক রবিউল ইসলাম, কনস্টেবল মো: রেজাউল, কনস্টেবল মো: মফিজুল এবং কনস্টেবল মো: রাসেল।
ঘটনার বিষয়ে জানতে বুধবার রাতে কয়েকজন সংবাদকর্মী ক্রসিং হাইওয়ে পুলিশ স্টেশনে গেলে সাব-ইন্সপেক্টর মোস্তাফিজুর রহমানকে প্রথমে অফিসে পাওয়া যায়নি। পরে রাত ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে তার সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংবাদকর্মীদের ‘বসেন, চা খান, আমি আসতেছি’ বলে জানান। পরে রাত ৯টা ৫ মিনিটের দিকে তিনি স্টেশনে আসেন।
এ সময় গাড়িটি কেন টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাব-ইন্সপেক্টর মোস্তাফিজুর রহমান দাবি করেন, গাড়িটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
তখন সংবাদকর্মীরা মামলার সময় ও কাগজ দেখতে চাইলে দেখা যায়, রাত ৯টা ১ মিনিটে ওই গাড়ির বিরুদ্ধে ২ হাজার ৫০০ টাকার মামলা করা হয়েছে। মামলার কেস স্লিপ নম্বর—৯৮১০২১৩৪৩৮। অর্থাৎ সংবাদকর্মীরা পুলিশ স্টেশনে অবস্থান করার সময়ই গাড়িটির বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয় বলে কাগজপত্রে দেখা যায়।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাড়িটি আটক করার পর যদি আইন অনুযায়ী মামলা করার মতো অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে তখনই মামলা না করে কেন টাকা নিয়ে গাড়িটি ছেড়ে দেয়া হলো? আবার কয়েক ঘণ্টা পর সংবাদকর্মীদের উপস্থিতির সময় কেন একই গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা করা হলো?
এ বিষয়ে সাব-ইন্সপেক্টর মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে সরাসরি জানতে চাওয়া হয়, ‘টাকা নিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছেন, এখন কেন আবার মামলা দেয়া হলো?’ তবে অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। পরে তিনি বলেন, এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে হলে ওসি সাহেবের কাছ থেকে নিতে হবে।
পরে ক্রসিং হাইওয়ে পুলিশের অফিসার ইনচার্জ হারুনুর রশীদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি তখনই অবগত হয়েছেন। তিনি কুমিল্লায় একটি কনফারেন্সে রয়েছেন এবং বর্তমানে দায়িত্বে নেই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দায়িত্ব সাব-ইন্সপেক্টর মোস্তাফিজুর রহমানকে দিয়ে এসেছেন এবং বর্তমানে দায়িত্ব তার।
অভিযোগ রয়েছে, টাকা লেনদেনের সাথে জড়িত একজন ব্যক্তি পরবর্তীতে সিএনজি চালক মো: হাসানকে হুমকি দিয়েছেন। ওই ব্যক্তি তাকে বলেন, ‘এই রোডে কীভাবে গাড়ি চালাও দেখব।’ তারপরে ৪০/৫০ হাজার টাকার মামলা দেয়ার ভয়ও দেখানো হয়।
এ ঘটনায় সিএনজি চালকের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। টাকা দেয়ার অভিযোগ করার পর যদি তাকে বড় অঙ্কের মামলার ভয় দেখানো হয়ে থাকে, তাহলে এর দায় কার—এ প্রশ্নও উঠেছে।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, কর্ণফুলীসহ বিভিন্ন এলাকায় হাইওয়ে পুলিশ প্রায় সময় যানবাহন থামিয়ে মামলার ভয় দেখিয়ে চালকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা আদায় করে পরে গাড়ি ছেড়ে দেয়। এ ধরনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে থাকলেও এর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এখন প্রশ্ন থেকে যায়, ২ হাজার টাকা কার মাধ্যমে এবং কার নির্দেশে নেয়া হয়েছিল? টাকা নেয়ার পর গাড়ি ছেড়ে দেয়া হলে কয়েক ঘণ্টা পর আবার একই গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা করা হলো কেন? মামলাটি রাত ৯টা ১ মিনিটে করা হলেও গাড়িটি বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আটক করা হয়েছিল—এই সময়ের ব্যবধানের কারণ কী?
সংবাদকর্মীরা পুলিশ স্টেশনে অবস্থান করার সময়ই কেন মামলাটি করা হলো? মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা নেয়ার অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে? অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করার পর সিএনজি চালককে ৪০/৫০ হাজার টাকার মামলা দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে—এ অভিযোগের তদন্ত হবে কি? একজন সাধারণ সিএনজি চালক অভিযোগ করার কারণে যদি হয়রানি বা প্রতিশোধমূলক মামলার আশঙ্কায় থাকেন, তাহলে তার নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে? মামলা করার আইনগত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আগে টাকা নিয়ে গাড়ি ছাড়ার অভিযোগ উঠলে এর জবাবদিহি কোথায়?
চট্টগ্রাম হাইওয়ে পুলিশের এএসপি শাহ মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, ‘গতকাল সিএনজি অটোরিকশা ড্রাইভারের সাথে এসআই মোস্তাক যে ঘটনা ঘটিয়েছে তা সত্যিই দুঃখজনক। ‘দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রতিনিধি’ এ বিষয়টি সত্যতা প্রমাণ হলে ঐ এসআইয়ের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন কিনা তা জিজ্ঞেস করলে তখন তিনি বলেন, বিষয়টি আমি যাচাই করে দেখব। যদি তা সত্য হয় অবশ্যই তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হবে।
চট্টগ্রাম হাইওয়ে পুলিশের এসপি মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান বলেন, ‘আমি বিষয়টি আপনার থেকে শুনেছি। তারপরও আমি ওই সিএনজি অটোরিকশা ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে চাই। আপনি আমার মোবাইল নম্বর তাকে দিয়ে আমাকে একটা কল দিতে বলেন।’



