ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি সংসদীয় আসনে জমে উঠেছে শেষ মুহূর্তের ভোটের লড়াই। আনুষ্ঠানিক প্রচারণার সময় শেষ হলেও প্রার্থী ও তাদের কর্মীরা ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় প্রতিটি আসনেই তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ।
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন সমমনা জোট, ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি ও বিএনপির একাধিক বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপস্থিতিতে জেলার বেশ কয়েকটি আসনে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে। বিশেষ করে চারটি আসনে বিএনপির বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা দলীয় প্রার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) : হাওরবেষ্টিত এ আসনে মোট ভোটার দুই লাখ ৭৫ হাজার ৬২৯ জন। এখানে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এম এ হান্নান (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী এ কে এম আমিনুল ইসলাম (দাঁড়িপাল্লা) ও বিএনপির বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী এ কে এম কামরুজ্জামান (ঘোড়া) ও ইকবাল চৌধুরীর (কলার ছড়ি) মধ্যে মূল লড়াই ঘিরে আলোচনা।
স্থানীয় পর্যবেক্ষণে বিএনপির ভোট বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। দলের একটি অংশ বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয় থাকায় এম এ হান্নান চাপে রয়েছেন। এ সুযোগে জামায়াত প্রার্থীও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানে বিএনপি বনাম জামায়াতের সরাসরি লড়াই হলেও বিদ্রোহীদের কারণে সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে। শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জামায়াত বিজয়ের সম্ভাবনায় রয়েছে এমন আলোচনাও রয়েছে স্থানীয়ভাবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) : এ আসনে মোট ভোটার প্রায় চার লাখ ৯৯ হাজার। এই আসনে বিএনপি সরাসরি প্রার্থী দেয়নি; সমর্থন দিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবকে (খেজুর গাছ)। জামায়াতে ইসলামীও সরাসরি প্রার্থী না দিয়ে সমর্থন দিয়েছে এনসিপির মাওলানা আশরাফ উদ্দিন মাহদিকে (শাপলা কলি)।
তবে মাঠের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন বিএনপির বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা (হাঁস প্রতীক) ও আরেক বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এন তরুণ দে (কলার ছড়ি)। একইসাথে সক্রিয় রয়েছেন এনসিপির প্রার্থী আশরাফ উদ্দিন মাহদিও।
ভোটারদের একটি বড় অংশের মতে, এখানে রুমিন ফারহানা, এস এন তরুণ দে ও জুনায়েদ আল হাবীবের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে। প্রচার-প্রচারণা ও জনসমর্থনের বিচারে রুমিন ফারহানা এগিয়ে এমন আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে হিন্দু ভোটব্যাংক ও আঞ্চলিক প্রভাবের কারণে এস এন তরুণ দে-ও আলোচনায়। বিশ্লেষকদের ধারণা, এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারো বিজয়ের সম্ভাবনাই বেশি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) : জেলার সবচেয়ে বড় এ আসনে ভোটার ছয় লাখ ২৪ হাজার ৬০১ জন। এখানে বিএনপির প্রার্থী প্রকৌশলী খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল (ধানের শীষ) তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
জামায়াত এ আসনটি ছেড়ে দিয়ে এনসিপিকে সমর্থন দিয়েছে। অন্য প্রার্থীরা তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় বিএনপি প্রার্থীর বিজয়ের সম্ভাবনা বেশি এবং লড়াই তুলনামূলকভাবে একপেশে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) : এ আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৪৩ হাজার ৯০৯ জন। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ড. মুশফিকুর রহমান (ধানের শীষ) ও জামায়াতে ইসলামীর আতাউর রহমান সরকারের (দাঁড়িপাল্লা) মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে।
স্থানীয় বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির বড় ভোটব্যাংক থাকলেও জামায়াত প্রার্থী শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন। ড. মুশফিকুর রহমান ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের এমপি ছিলেন। তবে বয়সের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। অন্যদিকে তুলনামূলক তরুণ প্রার্থী আতাউর রহমান সরকারের সক্রিয়তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। ফলে এ আসনেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস রয়েছে; জামায়াত প্রার্থীর সম্ভাবনাও আলোচনায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) : মোট ভোটার চার লাখ ৭৪ হাজার ৮২৬ জন। এখানে বিএনপির আবদুল মান্নান (ধানের শীষ), বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী নাজমুল হোসেন তাপস (ফুটবল) ও খেলাফত মজলিসের আমজাদ হোসাইন (রিকশা) এই তিন প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই স্পষ্ট।
বিএনপির ভোট দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ায় বিদ্রোহী প্রার্থী তাপস শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। পাশাপাশি খেলাফত মজলিসও মাঠে সক্রিয়। ফলে ধানের শীষ, ফুটবল ও রিকশা প্রতীকের মধ্যে জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) : এ আসনে মোট ভোটার দুই লাখ ৮৯ হাজার ৬৭৪ জন। বিএনপি সরাসরি প্রার্থী দেয়নি; সমর্থন দিয়েছে গণসংহতি আন্দোলনের জুনায়েদ সাকিকে (মাথাল)। তার সাথে লড়াই করছেন জামায়াত প্রার্থী মো: মহসিন (দাঁড়িপাল্লা) ও বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী ড. সায়দুজ্জামান কামাল (হরিণ)।
স্থানীয়ভাবে এটি ত্রিমুখী লড়াই হিসেবে বিবেচিত হলেও বিএনপির ভোটের আংশিক বিভাজন জামায়াতের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। টকশো ও রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে পরিচিত জুনায়েদ সাকির পাশাপাশি জামায়াত প্রার্থী মো: মহসিনও সাবেক ছাত্রনেতা হিসেবে মাঠে সক্রিয়। অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রার্থী হয়েও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্ত অবস্থান নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে গণসংহতি সমর্থিত প্রার্থী ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।
সার্বিক চিত্র
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি আসনের মধ্যে ১, ৪ ও ৬ নম্বর আসনে জামায়াতে ইসলামী শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অবস্থান নিয়েছে এবং কয়েকটিতে বিজয়ের সম্ভাবনা আলোচনায় রয়েছে। ৫ নম্বর আসনে ত্রিমুখী লড়াই সবচেয়ে জমজমাট। ২ নম্বর আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন বলে আলোচনা, আর ৩ নম্বর আসনে বিএনপির প্রার্থী তুলনামূলক স্বস্তিতে।
এবারের নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের উপস্থিতিই জেলার ভোটের সমীকরণ বদলে দিয়েছে এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।



