দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন মাসের মাথায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। সরকারিভাবে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখানো হলেও তার এই আকস্মিক সরে দাঁড়ানোর পেছনে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নানা বাস্তবতা কাজ করেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার পর দ্রুত তা গ্রহণ করায় কৌতূহল আরো বেড়েছে।
পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এবং এ নিয়ে সৃষ্ট বিভিন্ন চাপের সাথে তার পদত্যাগের সম্পর্ক থাকতে পারে। আবার কেউ কেউ স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করছেন। যদিও জেলা বিএনপির নেতারা এমন কোনো কোন্দলের বিষয় সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ অনেকের কাছে নব্বইয়ের দশকের সেই সময়ের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে, যখন রাঙ্গামাটির স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ানও দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন।
সরকারি উচ্চপদস্থ বিচারিক কর্মকর্তা থেকে রাজনীতিতে এসে রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির নেতৃত্ব দেয়া এবং পরে পার্বত্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া দীপেন দেওয়ানকে ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ছিল অনেক। ফলে তার পদত্যাগে হতাশা ও বিস্ময় দুই-ই দেখা দিয়েছে। তাদের প্রশ্ন, এমন কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে দায়িত্ব নেয়ার তিন মাসের মধ্যেই তাকে সরে যেতে হলো?
জেলা বিএনপির দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, প্রায় দুই দশক ধরে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন দীপেন দেওয়ান। শারীরিক নানা জটিলতা থাকা সত্ত্বেও তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে দলের জন্য কাজ করে গেছেন। তিনি অত্যন্ত ভদ্র, সদালাপী ও বিনয়ী একজন রাজনীতবিদ।
তাদের দাবি, রাজনৈতিক জীবনে নানা প্রতিকূলতা, বঞ্চনা ও ত্যাগের মধ্য দিয়েই তিনি এগিয়েছেন। ১/১১-পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যুক্ত হন। গত ১৭ বছরে বিএনপির অনেক নেতা-নেতাকর্মী ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও তিনি সংগঠনের সাথেই সম্পৃক্ত থেকেছেন।
দলীয় নেতাকর্মীরা মনে করেন, তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অবদান ও ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবেই ২০২৬ সালের নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে দলীয় মনোনয়ন দেন। রাঙ্গামাটির মানুষের সমর্থনে তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন এবং পরে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
তবে মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পাওয়ার পর সমতল এলাকার নেতা মীর হেলালকে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী করা হলে পাহাড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের একটি অংশ বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয়নি। এ নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে দীপেন দেওয়ানকে।
এদিকে অনেকের মতে, পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনের তিন মাস অতিক্রম করলেও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়নি। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে তুলনামূলকভাবে জটিলতা কম থাকলেও রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ পুনর্গঠন নিয়ে নানা সমীকরণ সামলাতে হয়েছে তাকে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের ধারণা, দলীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, বিভিন্ন পক্ষের মতামত, সাংগঠনিক ভারসাম্য রক্ষা এবং পারিবারিক চাপ— সব মিলিয়ে তিনি একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন। এসব কারণও তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
এ বিষয়ে রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপু বলেন, ‘পার্বত্যমন্ত্রী কেন পদত্যাগ করেছেন, সেটি তিনি তার পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন। তার পদত্যাগের বিষয়ে আমরা বিস্তারিত কিছু জানি না। তবে আমাদের দলের মধ্যে কোনো কোন্দল নেই। আমরা সবসময় আমাদের সাবেক সভাপতি দীপেন দেওয়ান এমপি ও মন্ত্রীকে সম্মান করেছি।’
অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা বলেন, ‘স্যার শারীরিক অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করেছেন। এর বাইরে আর কিছু নেই।’
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের কারণ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা থাকলেও এটুকু স্পষ্ট যে, পার্বত্য রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ এক পর্যায়ে তার এই সরে দাঁড়ানো নতুন করে আলোচনা ও বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে। এটি শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রত্যাশা ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে চলমান বিতর্ককেও সামনে নিয়ে এসেছে।



