জামায়াত আমির

ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়তে ১১ দলীয় জোট-প্রার্থীদের ভোট দিন

তিনি রোববার দুপুরে কুষ্টিয়া আবরার ফাহাদ স্টেডিয়াম মাঠে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যজোটের উদ্যোগে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।

আ ফ ম নুরুল কাদের, কুষ্টিয়া

Location :

Kushtia
কুষ্টিয়ার জনসভায় বক্তব্য রাখছেন জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান
কুষ্টিয়ার জনসভায় বক্তব্য রাখছেন জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান |নয়া দিগন্ত

ন্যায় ও ইনসাফের নতুন বাংলাদেশ গড়তে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থীদের প্রতীকে ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করা হবে।’

তিনি রোববার (২৬ জানুয়ারি) দুপুরে কুষ্টিয়া আবরার ফাহাদ স্টেডিয়াম মাঠে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যজোটের উদ্যোগে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।

জামায়াত আমির বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করা হবে। সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে। মজলুমের ওপর জুলুম বন্ধ হবে। নাগরিকদের সুবিধা প্রদানে সর্বাত্মক প্রধান্য দেয়া হবে। দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠন করা হবে। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা হবে ইনশাআল্লাহ।’

তিনি বলেন, ‘দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে জামায়াত বদ্ধপরিকর থাকবে। পদ্মা-গড়াই-তিস্তা নদী গ্রীষ্মকালে মরুভূমিতে পরিণত হয়। ৫৪ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে নদীর গতি-প্রকৃতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয় অথচ কোনো কাজ হয়নি। দুর্নীতি আর লুটপাটের মাধ্যমে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ টাকা শুধুই অপচয় হয়। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকারকে অবশ্যই জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। জনপ্রতিনিধির নামে জনগণকে শোষণ করার দিন শেষ। জনপ্রতিনিধিদের শাসক নয়, সেবক হতে হবে। আর যারা দুর্নীতির সাথে জড়িত তাদের সংশোধনের সুযোগ দেয়া হবে। যারা সুযোগ কাজে লাগাবে তারাই কল্যাণকর হবে আর বাকিদের উপযুক্ত শাস্তির মোকাবেলা করতে হবে।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের কবল থেকে জাতিকে মুক্ত করতে এ অঞ্চলের মানুষ সর্বোচ্চ ত্যাগ শিকার করেছেন। অনেক শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা নতুনভাবে স্বাধীনতা পেয়েছি। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে আমাদের ধরে রাখতে হবে।’

কুষ্টিয়াবাসীকে সৌভাগ্যবান হিসেবে উল্লেখ করে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই জেলার কৃতী সন্তান শহীদ আবরার ফাহাদ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম কলম ধরার অপরাধে তাকে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল। হত্যাকারীরা পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট পরিচয় বহন করে। জাতি তাদের কোনোদিনই ক্ষমা করবে না। ২৪-এ আমাদের সূর্যসন্তানেরা তাদের জীবন দিয়ে দেশকে ফ্যাসিস্টমুক্ত করেছে। তারা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না। আগামীতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে তারা কাউকে ছাড় দেবে না।’

‘হাদিকে হত্যা করে ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের নগ্নতার পরিচয় দিয়েছে। দেশের দামাল ছেলেরা আবু সাঈদ, আবরার ও হাদির ত্যাগের বিনিময়ে প্রয়োজন আবারো ফ্যাসিস্ট মোকাবেলায় ঝাঁপিয়ে পড়বে,’ বলেন তিনি।

জামায়াত আমির আরো বলেন, ‘একটি বিপ্লব কোটি কোটি বিপ্লবের জন্ম দেয়। তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আগামীতে এই বাংলায় কোরআন-হাদীসের আলোকেই সমাজ গঠন হবে আর তার সুবাতাস ও ঘ্রান পেতে শুরু করেছে মানুষেরা।’

গুম ও খুন বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি যখন গুম ও খুন হওয়া পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলি তখন আমি তাদের চোখে পানির পরিবর্তে রক্ত দেখতে পাই। তারা কতটা মজলুম ছিল তা বলে বোঝানো যাবে না। তাদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে ২৪-এর আগস্ট।’

তিনি বলেন, ‘কুষ্টিয়া চিনিকল, মোহিনী মিলসহ কুমরাখালীর তাঁতশিল্পগুলো বন্ধ রয়েছে। এসব বন্ধ কারখানা চালু করে উৎপাদনের সক্ষম অর্জনের সর্বাত্মক চেষ্টা করবে জামায়াতে ইসলাম।’

যুবকদের বেকার ভাতা নয়, দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা হবে- উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘বেকারত্ব জাতির অভিশাপ। যারা জাতিকে নিয়ে ভাবে না, জাতির জন্য যাদের পরিকল্পনা নেই, তারাই যুবকদের বেকার ভাতার দেয়ার ঘোষণা দেয়। জামায়াতে ইসলামী যুবসমাজকে দক্ষ জাতি হিসেবে গড়ে তুলে দেশকে সমৃদ্ধশালী করবে ইনশাআল্লাহ।’

তিনি বলেন, ‘পরিবারের মতোই দেশকে নারী-পুরুষের সমন্বয়ে গড়ে তুলতে হবে।’

বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতিতে নারীরা সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘জামায়াত ক্ষমতায় গেলে নারীসমাজের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় নারীদের জন্য বড় শহরে বাস সার্ভিস চালু করা হবে। নারী সমাজের অধিকার, স্বাধীনতা, মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রীয়ভাবে পদক্ষেপ নেয়া হবে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না, সহ্য করা হবে না।’

তিনি বলেন, ‘হাদি, আবরার ও আবু সাঈদ একজন মায়ের গর্ভে ছিলেন। নারীরা আমাদের মা-বোন, তাদের সম্মান ও মর্যাদার প্রতি আমরা সর্বদা দায়িত্ববোধের পরিচয় দেব। আজ যখন নির্বাচনী কাজে জামায়াতের নেতাকর্মীরা মানুষের বাড়িতে বাড়িতে যাচ্ছে তখন নারীদের অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে তাদের গায়ে হাত তোলা হচ্ছে। একজন ভালো মানুষের পক্ষে অন্য একজন নারীর গায়ে আঘাত করা ও অসম্মান করা জঘন্য ঘৃণীত কাজ। এই কাজগুলো যারা করছে তাদের সবাইকে এই সমাজের মানুষেরা চিনছে এবং জানছে। একদিন আল্লাহর দরবারে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা ফ্যাসিবাদের ছায়ামুক্ত বাংলাদেশ চাই, আধিপত্যবাদমুক্ত বাংলাদেশ চাই। যারা জনগণের মুখের ভাষা বুঝতে পারে না, জনগণ তাদেরকে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘জামায়াত দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলে আমরা কোনো মায়ের সন্তানকে চাঁদাবাজ হতে দেবো না। চাঁদাবাজদের জন্য আমরা কর্মের ব্যবস্থা করবো। একটি সুখি-সমৃদ্ধ মানবিক বাংলাদেশ গড়তে সমাজের অপরাধ দমনের জন্য যা যা করণীয় তার সবকিছু করা হবে।’

তিনি জনসাধারণকে জুলাই সনদের বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি, ‘না’ মানে গোলামী। তাই আপনারা এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবেন।”

জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির ও মিরপুর-ভেড়ামারা আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী আব্দুল গফুরের সভাপতিত্বে জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জামায়াত নেতা কুষ্টিয়া-যশোর আঞ্চলিক প্রধান মোবারক হোসেন। বক্তব্য রাখেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান, যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চল টিম সদস্য অধ্যক্ষ খন্দকার এফ এম আলী মুহসিন, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যাপক সুজাউদ্দিন জোয়ার্দার, শিবিরের কেন্দ্রীয় ছাত্রঅধিকার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া-১ আসনের প্রার্থী উপাধাক্ষ্য বেলাল উদ্দিন, কুষ্টিয়া-২ আসনের প্রার্থী আব্দুল গফুর, কুষ্টিয়া সদর আসনের প্রার্থী মুফতি আমীর হামজা, কুষ্টিয়া-৪ আসনের প্রার্থী আফজাল হোসেন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক ফরহাদ হোসাইন, খেলাফত মজলিশের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক সিরাজুল হক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কুষ্টিয়া জেলা আমির মাওলানা আব্দুল লতিফ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতা ইমাম নোমানী রাব্বী, এবি পার্টির জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক বেলাল মাহমুদ, ছাত্রশিবির শহর শাখার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, কুষ্টিয়া জেলা সভাপতি ইউসুফ আলী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান ও শহর জামায়াতের আমির এনামুল হক।

জামায়াতের এই নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিতে ভোরেই জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নারী ও পুরুষেরা আসতে শুরু করেন। পুরো স্টেডিয়ামের গ্যালারি, মাঠ এবং আশপাশের এলাকা মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে উঠে।