ময়মনসিংহ বিভাগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং কর্মসূচিকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। লক্ষাধিক শিক্ষার্থী নির্ধারিত দিনে খাবার না পেয়ে বঞ্চিত হয়েছে। কোথাও কোথাও শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবারের পরিবর্তে পচা কলা ও বাসি রুটি সরবরাহের অভিযোগও পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ‘কাগজে-কলমে’ প্রকল্প চললেও মাঠপর্যায়ে তা ভেঙে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি, ঝরে পড়া রোধ এবং পুষ্টিহীনতা দূরীকরণের লক্ষ্যে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সহায়তায় গত বছরের ১৭ নভেম্বর এই কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। তবে বাস্তবে নির্ধারিত সময়ের ১৩ দিন পর থেকে খাবার বিতরণের কথা থাকলেও শুরু থেকেই খাবার সরবরাহ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
প্রথম ধাপে ময়মনসিংহের ফুলপুর, ঈশ্বরগঞ্জ, ধোবাউড়া ও হালুয়াঘাটসহ মোট ১০টি উপজেলায় কর্মসূচি চালু করা হয়। কিন্তু শুরুতেই পচা-বাসি খাবার সরবরাহ নিয়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়। বিষয়টি বিভাগীয় প্রশাসন পর্যন্ত গড়ালে এক সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিভাগীয় কমিশনার মিজ ফারাহ শাম্মী।
এদিকে রোববার (২৯ মার্চ) দ্বিতীয় ধাপের কর্মসূচি উদ্বোধনের কথা থাকলেও প্রথম দিনেই ভেস্তে যায় কার্যক্রম। গৌরীপুর, নেত্রকোণা সদর, বারহাট্টা, নকলা ও নালিতাবাড়ী- এই পাঁচটি উপজেলার প্রায় ছয় শতাধিক বিদ্যালয়ের লক্ষাধিক শিক্ষার্থী কোনো খাবার পায়নি। এতে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
গৌরীপুর উপজেলার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘একাধিক বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, প্রথম দিনে শিক্ষার্থীরা কোনো খাবার পায়নি। এমনকি কারা খাবার সরবরাহ করছে, সেটিও আমাদের জানা নেই।’
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সাঈদা রুবাইয়া বলেন, ‘বিকেলে কয়েকটি বিদ্যালয়ে খাবার দেয়ার কথা শুনেছি, তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য আমার কাছে নেই।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সহকারী কর্মকর্তা মো: আবু ইউসুফ খান বলেন, ‘খাবার সরবরাহ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য নেই। উপজেলা থেকে প্রতিবেদন এলে বিস্তারিত জানা যাবে।’
অভিযোগ রয়েছে, অধিদফতরের নির্দেশনা অনুযায়ী ইউনিফর্ম ও আইডি কার্ডধারী কর্মীদের মাধ্যমে মানসম্মত খাবার সরবরাহের কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। গোপন চুক্তির মাধ্যমে স্থানীয় প্রভাবশালী ঠিকাদারদের দিয়ে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে প্রকৃত শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত রেখে অতিরিক্ত বিল উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রথম ধাপে ঢাকার আইসল্যান্ড ট্রেডিং লিমিটেডের কর্ণধার শাহাদাত হোসেন এবং দ্বিতীয় ধাপে বাবুবাজারের সমতা ট্রেডার্সের কাউছার আহম্মেদ ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্ব পান। তবে বাস্তবে স্থানীয় পর্যায়ে ‘সাব-কন্ট্রাক্ট’ দিয়ে কাজ পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় ঠিকাদার মাহাবুব স্বীকার করেন, ‘দায়িত্বপ্রাপ্তদের অপারগতার কারণে ১০টির মধ্যে পাঁচটি উপজেলায় প্রথম দিনে খাবার দেয়া সম্ভব হয়নি।’ তিনি দাবি করেন, এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
এদিকে আইসল্যান্ড ট্রেডিংয়ের কর্ণধার শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘প্রথম ধাপে অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত চলছে। তবে বিতর্কিত ১৩ দিনের বিল এখনো বকেয়া রয়েছে।’
তিনি আরো অভিযোগ করেন, ‘স্থানীয়ভাবে ঠিকাদার না দিলে রাজনৈতিক চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হয়। এ কারণে সমঝোতার মাধ্যমে কাজ করতে হচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিতের মতো একটি স্পর্শকাতর কর্মসূচিতে এ ধরনের অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, বরং এটি শিশুদের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরো অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
এ ঘটনায় বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ এবং স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।



