বৈশাখী মেলার জন্য প্রস্তুত শিবচরের মৃৎশিল্পীরা

‘আমাদের পূর্বপুরুষরাও এই কাজ করতেন। আমরাও সেই পেশা ধরে রেখেছি। অন্য কোনো কাজ শেখার সুযোগ হয়নি। সরকারি সহায়তা পেলে আমরা আরো ভালোভাবে এগিয়ে যেতে পারতাম।’

শিবচর (মাদারীপুর) সংবাদদাতা

Location :

Shibchar
বৈশাখী মেলা উপলক্ষে মাটির তৈজসপত্র তৈরিতে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা
বৈশাখী মেলা উপলক্ষে মাটির তৈজসপত্র তৈরিতে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা |নয়া দিগন্ত

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার ভদ্রাসন ইউনিয়নের পালপাড়া ও পাঁচ্চর ইউনিয়নের গোয়ালকান্দা যেন ছোট ছোট কারখানার সমাহার হয়ে উঠেছে। প্রতিটি ঘরেই চলছে মাটির তৈজসপত্র তৈরির কর্মযজ্ঞ। নারী-পুরুষের পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীরাও অংশ নিচ্ছে এসব কাজে। পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে বিক্রি বাড়ার আশায় দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।

চুল্লিতে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন, আর চারপাশে পোড়া মাটির গন্ধ। আঠালো মাটিতে হাত ডুবিয়ে ঘোরানো হচ্ছে চাকা। তাতে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে হাঁড়ি-পাতিল, কলস, পুতুল, ব্যাংক ও নানা ধরনের খেলনা। যেন নিস্তব্ধ মাটির ভেতর থেকে জন্ম নিচ্ছে এক জীবন্ত শিল্প।

বৈশাখ এলেই নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় এই শতবর্ষী ঐতিহ্য। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা মৃৎশিল্প এখনো টিকে আছে কুমারপাড়ার কয়েকটি পরিবারের হাত ধরে। তবে আগের মতো চাহিদা না থাকায় ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এগোচ্ছে এই ঐতিহ্যগত পেশাটি।

শিবচরের বিভিন্ন পালপাড়া ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে মাটির কাজ। মাটি কাটা, বালুর সাথে মিশিয়ে প্রস্তুত করা, চাকা ঘুরিয়ে আকৃতি দেয়া, রোদে শুকানো, এরপর চুল্লিতে ২৪-৩০ ঘণ্টা ধরে পোড়ানো পর তৈরি হয় মাটির তৈজসপত্র। একটি সম্পূর্ণ ব্যাচ প্রস্তুত করতে সময় লাগে প্রায় ১৫-২০ দিন।

Madaripur-Potcher22

এই কাজে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। কেউ মাটি কেটে আনছেন, কেউ পা দিয়ে মাটি মেশাচ্ছেন, কেউ তৈরি পণ্য শুকাতে দিচ্ছেন, আবার কেউ নকশা ও রঙয়ের কাজ করছেন।

এক সময় এখানকার মাটির হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল ও খেলনার ব্যাপক চাহিদা ছিল স্থানীয় হাট-বাজারে। কিন্তু প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিলের পণ্যের প্রসারে সেই চাহিদা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে সঙ্কটে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প।

তবে বৈশাখী মেলা, গ্রামীণ মেলা ও গলিয়া মেলার মতো উৎসবগুলোতে কিছুটা চাহিদা থাকায় এখনো আশা ছাড়েননি কারিগররা। ভালোবাসা, শ্রম আর ঐতিহ্যের টানে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন পারিবারিক এই পেশা।

ভদ্রাসনের মৃৎশিল্পী নারায়ণ পাল বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরাও এই কাজ করতেন। আমরাও সেই পেশা ধরে রেখেছি। অন্য কোনো কাজ শেখার সুযোগ হয়নি। এই কাজই আমাদের জীবিকার একমাত্র ভরসা। বর্তমানে মাটির দাম তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় তেমন লাভ হচ্ছে না। সরকারি সহায়তা পেলে আমরা আরো ভালোভাবে এগিয়ে যেতে পারতাম।’

পাঁচ্চরের মৃৎশিল্পী নগেন পাল বলেন, ‘সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমাদের মৃৎশিল্পটা টিকে থাকত। ছোটবেলা থেকেই বাবা-মার সাথে থেকে এ কাজ শিখেছি। অন্য পেশায় যাওয়া এখন সম্ভব না। বেঁচে থাকার তাগিদে এ পেশাকে ভালোবেসে ফেলেছি।’

ঐতিহ্য আর সংগ্রামের মিশেলে টিকে থাকা এই মৃৎশিল্প এখন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে বৈশাখের রঙে রাঙিয়ে।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, ‘ভদ্রাসনের মৃৎশিল্প আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারিগররা আগ্রহী হলে তাদের জন্য ক্ষুদ্র ঋণসহ বিভিন্ন সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে, যাতে এই শিল্প টিকে থাকে এবং আরো সমৃদ্ধ হয়। তাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে।’